আওয়ামী মেম্বার রফিকুলের ছত্রছায়ায় বেপরোয়া হয়ে ওঠে ঘাতক রানা

ওয়াসিম সিদ্দিকী

আওয়ামী মেম্বার রফিকুলের ছত্রছায়ায় বেপরোয়া হয়ে ওঠে ঘাতক রানা

খুদে সহপাঠীদের অবুঝ চোখের পানি আর স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদে চিরবিদায় নিয়েছে রাজধানীর পল্লবীর পপুলার মডেল স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তার। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের মধ্যম শিয়ালদী গ্রামে দাদা-দাদির কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত ছোট্ট রামিসা। কিন্তু এই নৃশংস, বুক কাঁপানো হত্যাকাণ্ডের পর রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে ঘাতক সোহেল রানার গ্রামের বাড়ি নাটোরের সিংড়া পর্যন্ত বইছে তীব্র ক্ষোভ, ধিক্কার আর নিন্দার ঝড়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক তথ্য।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মেম্বার রফিকুলের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এলাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল এই রানা। একপর্যায়ে গ্রামে টিকতে না পেরে ঢাকায় এসে আশ্রয় নিলেও তার অপরাধের মাত্রা কমেনি। বরং দিন দিন সে আরো হিংস্র পিশাচে রূপ নিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, নাটোরের সিংড়া উপজেলার মহেশচন্দ্রপুর দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা জাকির আলীর তিন সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে ঘাতক সোহেল রানা (৩৪)। এলাকায় সে সাইকেল ও রিকশা মেকানিকের কাজ করত। স্থানীয়দের মতে, এটি ছিল তার আসল অপরাধ ঢাকার খোলস মাত্র। তার মূল নেশা ছিল চুরি, মাদক ও অনলাইন জুয়া। এলাকায় সে আওয়ামী লীগের স্থানীয় প্রভাবশালী ইউপি সদস্য রফিকুলের ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত। মেম্বার রফিকুলের অন্ধ রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় ও আশকারা রানাকে বেপরোয়া করে তোলে।

অনলাইন জুয়া ও মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে সে এলাকায় একের পর এক চুরির ঘটনা ঘটায়। একপর্যায়ে প্রায় ৮-১০ লাখ টাকার বিপুল ঋণের বোঝা মাথায় চাপে তার। এই দেনার দায় মেটাতে না পেরে এবং ছেলের নানাবিধ অপকর্মে অতিষ্ঠ হয়ে তার বাবা জাকির আলী নিজের শেষ সম্বল জমি বিক্রি করে কিছু ঋণ পরিশোধ করেন। এরপর প্রায় তিন বছর আগে রানাকে বাড়ি থেকে চূড়ান্তভাবে তাড়িয়ে দেন। তখন থেকেই পরিবারের সঙ্গে তার সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।

পারিবারিক জীবনেও লম্পট

পারিবারিক জীবনেও চরম বিকৃতির পরিচয় দিয়েছে এই ঘাতক। প্রথম বিয়ে করার পর তার সংসারে এক ছেলেসন্তানের জন্ম হয়। ওই সংসার চলাকালেই ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে লম্পট রানা পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এই চরম নৈতিক স্খলন ও পারিবারিক কেলেঙ্কারির জেরে প্রথম স্ত্রী আট মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে তার কাছে রেখে তালাক দিয়ে চলে যেতে বাধ্য হন। সংসার ভেঙে যাওয়ার পর রানা সিংড়ার বালুয়া বাসুয়া এলাকায় দ্বিতীয় বিয়ে করে।

একের পর এক ডেরা বদল

ঢাকায় এসে পল্লবীর বিহারি ক্যাম্প ও সংলগ্ন এলাকায় আশ্রয় নেয় সে। বিহারি ক্যাম্পের এক বাসায় স্ত্রীসহ সাবলেট নিয়েছিল। কিন্তু সারাক্ষণ ইয়াবা সেবনের কারণে বাড়ির মালিকের স্ত্রী তীব্র আপত্তি তোলেন। মাত্র দুই মাসের মাথায় তাকে ওই বাসা থেকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। পরে পরিচিত কয়েকজনের তদবিরে পল্লবীর একটি ভবনের নিচের গ্যারেজে মেকানিক হিসেবে কাজ শুরু করে সে। ওই ভবনের কেয়ারটেকার মনির জানান, পরিচিতদের কথায় ওকে গ্যারেজে কাজ দিয়েছিলাম। কিন্তু ১৫ দিন ওর হাবভাব খুব একটা ভালো মনে হয়নি। নিয়মিত কাজে ফাঁকি দিত। একদিন আসে তো তিনদিন হাওয়া। পরে খোঁজ নিয়ে ওর ভয়াবহ মাদক সেবনের কথা জানতে পেরে গ্যারেজ থেকে না করে দিই।

তবে গ্যারেজের কাজ হারালেও ভবনেরই একটি ফ্ল্যাটে ভাড়াটিয়া মাসুদের কাছ থেকে একটি কক্ষ সাবলেট নেয় রানা-স্বপ্না আক্তার দম্পতি। সেখানেই ঘটে মর্মান্তিক ও পৈশাচিক ঘটনা।

এদিকে ফেসবুক ও অন্যান্য মাধ্যমে খবর রটেছিল, সিংড়ায় রানার গ্রামের বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। তবে এ তথ্যের কোনো সত্যতা মেলেনি।

স্থানীয় ইউপি মেম্বার মো. আফতাব আলী বলেন, রামিসার হত্যাকারী রানার গ্রামের বাড়িতে কোনো ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। তার বৃদ্ধ বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর কোনো অভিযোগ নেই। কারণ, তারা তিন বছর আগেই এই কুলাঙ্গারকে ত্যাজ্যপুত্র করেছেন। রানা যখন গ্রামে ছিল, তখন সে আওয়ামী লীগের রফিকুল মেম্বারের ছায়াতলে থেকে জুয়া ও চুরির নানা অপকর্মে লিপ্ত ছিল। জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমি এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের জন্য দ্রুততম সময়ে রানার ফাঁসি দাবি করছি।

বিচারের অপেক্ষায় দেশবাসী

বর্তমানে ঘাতক সোহেল রানা এবং তার সহযোগী হিসেবে স্ত্রী স্বপ্না ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছে। এখন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—সারা দেশের মানুষের চোখ আগামী সপ্তাহের পুলিশি চার্জশিট এবং আদালতের দিকে। দেশের আপামর সাধারণ মানুষের একটাই দাবি, কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা আইনি ফাঁকফোকর ছাড়াই যেন এই নরপিশাচের দ্রুততম সময়ে ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়, যাতে আর কোনো বাবার বুক এভাবে খালি না হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...