পরিবেশবান্ধব হাইড্রোজেন ট্রেন

পরিবেশবান্ধব হাইড্রোজেন ট্রেন

জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার বিশ্বজুড়ে পরিবহন খাতকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDGs) এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিভিন্ন দেশ পরিবহন ব্যবস্থাকে পরিবেশবান্ধব করার উদ্যোগ নিয়েছে।

সড়কপথে বৈদ্যুতিক যানবাহনের পাশাপাশি রেল পরিবহনেও শুরু হয়েছে সবুজ প্রযুক্তির নতুন অধ্যায়। সেই পরিবর্তনের অন্যতম বড় উদ্ভাবন হলো হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন। ডিজেলচালিত ট্রেনের বিকল্প হিসেবে এটি বিশ্বজুড়ে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কার্বন নিঃসরণ কমানো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে এই প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতের রেল পরিবহনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

হাইড্রোজেন ট্রেন কী

হাইড্রোজেন ট্রেন হলো এমন একটি আধুনিক রেলযান, যা চলার জন্য ডিজেল বা কয়লাভিত্তিক জ্বালানির পরিবর্তে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল ব্যবহার করে। ফুয়েল সেলের ভেতরে হাইড্রোজেন ও বাতাসের অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। সেই বিদ্যুৎ ট্রেনের বৈদ্যুতিক মোটর চালায়। এই প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড কিংবা কালো ধোঁয়া প্রায় নির্গত হয় না। উপজাত হিসেবে উৎপন্ন হয় মূলত পানি ও জলীয় বাষ্প। ফলে এটি পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই রেল প্রযুক্তির অন্যতম উদাহরণ।

কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি

হাইড্রোজেন ট্রেনে উচ্চচাপের বিশেষ ট্যাংকে হাইড্রোজেন গ্যাস সংরক্ষণ করা হয়। ট্রেন চলার সময় সেই গ্যাস ফুয়েল সেলে প্রবেশ করে এবং অক্সিজেনের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি ট্রেনের মোটরে সরবরাহ করা হয় এবং অতিরিক্ত শক্তি ব্যাটারিতে জমা থাকে। ট্রেন ব্রেক করার সময় যে শক্তি উৎপন্ন হয়, সেটিও আবার ব্যাটারিতে সংরক্ষিত হয়। ফলে শক্তির অপচয় কমে এবং জ্বালানির ব্যবহার আরো দক্ষ হয়। ডিজেল ইঞ্জিনের তুলনায় এই প্রযুক্তি অনেক কম শব্দ সৃষ্টি করে এবং পরিচালন ব্যয়ও দীর্ঘ মেয়াদে কম হতে পারে।

বিশ্বে হাইড্রোজেন ট্রেনের অগ্রযাত্রা

পরিবেশবান্ধব রেল প্রযুক্তিতে পথিকৃৎ জার্মানি। ২০১৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে বিশ্বের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত যাত্রীবাহী ট্রেন চালানোর পর ২০২২ সালে দেশটি বাণিজ্যিকভাবে এই প্রযুক্তি চালু করে। এরপর ফ্রান্স, ইতালি, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া নিজস্ব প্রযুক্তিতে হাইড্রোজেন ট্রেনের উন্নয়ন এবং পরীক্ষামূলক পরিচালনা শুরু করে। বর্তমানে ইউরোপের অনেক দেশ বিদ্যুতায়িত নয় এমন রেলপথে ডিজেল ট্রেনের পরিবর্তে হাইড্রোজেন ট্রেন চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ায়ও এই প্রযুক্তির যাত্রা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের পাশের দেশ ভারত গত ১৭ জুলাই প্রথম দেশীয়ভাবে নির্মিত হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন উদ্বোধন করেছে। এর মাধ্যমে ভারতও পরিবেশবান্ধব রেলপ্রযুক্তি ব্যবহারের পথে নতুন অধ্যায় শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিনির্ভর রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

কেন বাড়ছে হাইড্রোজেন ট্রেনের জনপ্রিয়তা

বিশ্বের বহু দেশে এখনো হাজার হাজার কিলোমিটার রেলপথ বিদ্যুতায়িত নয়। এসব পথে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালাতে নতুন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ও অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল ব্যয় হয়। সেখানে হাইড্রোজেন ট্রেন একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি বিদ্যমান রেললাইনেই চলতে পারে এবং আলাদা ওভারহেড বৈদ্যুতিক লাইনের প্রয়োজন হয় না। একই সঙ্গে দীর্ঘ দূরত্বে চলাচল, দ্রুত জ্বালানি ভরার সুবিধা এবং নিরবচ্ছিন্ন পরিচালন সক্ষমতার কারণে অনেক দেশ এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

হাইড্রোজেন ট্রেনের সুবিধা

হাইড্রোজেন ট্রেনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি প্রায় শূন্য কার্বন নিঃসরণ করে। ফলে বায়ুদূষণ কমে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করে। ডিজেলচালিত ট্রেনের তুলনায় শব্দ কম হওয়ায় জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এটি আরো উপযোগী। এছাড়া দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রমে এটি কার্যকর, জ্বালানি দক্ষতা বেশি এবং রিফুয়েলিংয়ের সময়ও তুলনামূলক কম। ভবিষ্যতে গ্রিন হাইড্রোজেনের উৎপাদন বাড়লে এই প্রযুক্তি আরো অর্থনৈতিক হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা

হাইড্রোজেন ট্রেনের সম্ভাবনা যতই উজ্জ্বল হোক, কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়েছে। পরিবেশবান্ধব গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদনের খরচ তুলনামূলক বেশি। হাইড্রোজেন সংরক্ষণ, পরিবহন ও সরবরাহের জন্য বিশেষ অবকাঠামো এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দক্ষ জনবল তৈরি এবং বিনিয়োগ নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। তবে প্রযুক্তির উন্নয়ন ও উৎপাদন ব্যয় কমার সঙ্গে সঙ্গে এসব সীমাবদ্ধতা ধীরে ধীরে দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা

বাংলাদেশ রেলওয়ে বর্তমানে নতুন রেললাইন নির্মাণ, ডাবল লাইন সম্প্রসারণ, আধুনিক কোচ সংযোজন এবং ভবিষ্যতে বিদ্যুতায়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এমন প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ মেয়াদে হাইড্রোজেনভিত্তিক রেলপ্রযুক্তি দেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প হতে পারে। বিশেষ করে, যেসব রুটে বিদ্যুতায়ন ব্যয়বহুল, সেখানে এই প্রযুক্তি কার্যকর সমাধান দিতে পারে। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর জাতীয় লক্ষ্য বাস্তবায়নেও এটি সহায়ক হতে পারে। তবে এর জন্য গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যতের পরিবহন

বিশ্বজুড়ে কার্বন নিরপেক্ষ অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে হাইড্রোজেনকে ভবিষ্যতের অন্যতম পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রেল পরিবহনকে আরো পরিবেশবান্ধব করতে হাইড্রোজেন ট্রেনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন, গ্রিন হাইড্রোজেনের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয় কমে এলে আগামী কয়েক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ট্রেনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন