মহাকাশ বিজ্ঞানে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। সৌরজগতের বাইরে এই প্রথম কোনো উপগ্রহের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল চিলিতে অবস্থিত ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরির ‘ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ’ (ভিএলটি) ব্যবহার করে এই উপগ্রহ শনাক্ত করেন। পৃথিবী থেকে মাত্র ৭১ আলোকবর্ষ দূরের ‘সিডি-৩৫ ২৭৭২’ নামক একটি নক্ষত্রব্যবস্থায় এই উপগ্রহের অবস্থান। মহাজাগতিক হিসেবে দূরত্বটি বেশ কম হলেও আবিষ্কৃত এই উপগ্রহ এবং এর অভিভাবক বস্তুর ধরন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের হতবাক করে দিয়েছে।
বিজ্ঞানীরা জানান, নতুন আবিষ্কৃত এই উপগ্রহ বিশাল আকারের। এটি ভরে অন্তত আমাদের সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ বৃহস্পতির সমান। এর চেয়েও বড় বিস্ময় হলো—উপগ্রহটি যাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, সেটি সাধারণ কোনো গ্রহ নয়। এটি মূলত একটি ‘বাদামি বামন’। এটি এমন এক গ্যাসীয় বস্তু, যা সাধারণ গ্রহের চেয়ে অনেক বড় হলেও নক্ষত্র হওয়ার মতো পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনে অক্ষম। এটি আকৃতিতে বৃহস্পতির চেয়ে প্রায় ৩৩ গুণ বড়।
গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক ও চিলির দিয়েগো পোর্তালেস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কেভিন হোয়াই জানান, এই বাদামি বামনগুলো সাধারণ গ্রহ ও ক্ষুদ্রতম নক্ষত্রগুলোর মধ্যবর্তী এক বিশেষ অবস্থায় থাকে।
সাধারণত সৌরজগতের বাইরের কোনো গ্রহ বা উপগ্রহকে সরাসরি দেখা কঠিন। কারণ পাশের নক্ষত্রের তীব্র আলোয় তাদের অস্তিত্ব ঢাকা পড়ে যায়। তাই বিজ্ঞানীরা মূলত দুটি পরোক্ষ পদ্ধতি ব্যবহার করেন—
১. ট্রানজিট পদ্ধতি
গ্রহ যখন তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যায়, তখন আলো সামান্য কমে যায়। এই আলোর পরিবর্তন মেপে গ্রহের আকার হিসাব করা হয়।
২. রেডিয়াল ভেলোসিটি পদ্ধতি
মহাকর্ষীয় টানের কারণে নক্ষত্রের মধ্যে যে সামান্য কম্পন বা পরিবর্তন তৈরি হয়, তা পর্যবেক্ষণ করে ভর বের করা হয়।
‘সিডি-৩৫ ২৭৭২’ নক্ষত্রব্যবস্থার বাদামি বামনটি বিশাল আকারের হওয়ায় ২০১১ সালেই সাধারণ অপটিক্যাল টেলিস্কোপে ধরা পড়েছিল। তবে ৭১ আলোকবর্ষ দূর থেকে এর চারপাশের এই উপগ্রহকে সরাসরি দেখা সম্ভব ছিল না। গবেষক কেভিন হোয়াই ও তার দল ‘রেডিয়াল ভেলোসিটি’ পদ্ধতি ব্যবহার করে বাদামি বামনটির ভেতরের মহাকর্ষীয় কম্পন পরিমাপ করেন এবং এভাবেই নতুন এই বিশাল উপগ্রহটির আকার ও উপস্থিতি নিশ্চিত করেন।
গবেষক কেভিন হোয়াই বলেন, ‘এই ব্যবস্থায় এটি তৃতীয় বস্তু হওয়ার কারণেই আমরা একে উপগ্রহ বা চাঁদ বলছি, যদিও আমাদের সৌরজগতের ছোট ও পাথুরে চাঁদগুলোর সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।’
এই আবিষ্কার জ্যোতির্বিজ্ঞানের পুরোনো কিছু সংজ্ঞাকে নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে—ঠিক কোন পর্যায়ে একটি ক্ষুদ্র নক্ষত্র গ্রহ হয়ে ওঠে, আর কখন বৃহস্পতির মতো কোনো বস্তু উপগ্রহ হিসেবে বিবেচিত হয়?
মহাকাশের গভীরে এমন অস্বাভাবিক ব্যবস্থা আরো আছে কি-না, তা জানতে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন গবেষকেরা। তারা ইতোমধ্যেই আরেকটি সম্ভাবনাময় ‘উপগ্রহের’ সন্ধান করছেন।
চিলিতে নির্মাণাধীন ‘এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ’ (ইএলটি) চালু হলে আলোর সংগ্রাহক ক্ষমতা ২০ গুণ বৃদ্ধি পাবে। ফলে ভবিষ্যতে সৌরজগতের বাইরের এমন অজানা জগত খুঁজে বের করা আরও সহজ হবে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

