তালাবদ্ধ সিঁড়ি ও অচল লিফটে বিপাকে হাজারো রোগী

তালাবদ্ধ সিঁড়ি ও অচল লিফটে বিপাকে হাজারো রোগী
ছবি: সংগৃহীত

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের নতুন ভবনে লিফটের কন্ট্রোল রুমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত সোমবার সন্ধ্যার ওই ঘটনায় পদদলিত হয়ে শিশুসহ ছয়জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া আহত হন আরো ২০ জন। আগুন লাগার পর আতঙ্কিত রোগী ও স্বজনরা দ্রুত নিচে নামতে গিয়ে হুড়োহুড়ি ও পদদলিত হয়ে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার সময় বেশিরভাগ সিঁড়ি বন্ধ থাকায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়।

এদিকে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার সকালে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে কমিটির প্রধান এবং সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খানকে সদস্যসচিব করা হয়েছে। কমিটিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুই প্রকৌশলী ও ফায়ার সার্ভিসের একজন প্রতিনিধি রয়েছেন। তিন কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবে তদন্ত কমিটিতে হাসপাতাল ও গণপূর্তের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের রাখায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, হাসপাতালের লিফট, রক্ষণাবেক্ষণ, জরুরি বহির্গমন ও সিঁড়ি ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্ব রয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে হাসপাতালের জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা নিয়ে। নতুন ভবনে পাঁচটি সিঁড়ি থাকলেও চারটির বিভিন্ন তলার প্রবেশপথে গ্রিল দিয়ে তালাবদ্ধ করে রাখার তথ্য পাওয়া গেছে। গতকাল সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, চারটি সিঁড়ির প্রবেশপথে তালা ঝুলছে। কয়েকটি গেটে মরিচাও ধরেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনেরা নিচে নামার চেষ্টা করলেও অধিকাংশ সিঁড়ি ব্যবহার করতে পারেননি। ফলে একটি সিঁড়ি দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ বের হওয়ার চেষ্টা করেন। এতে হুড়োহুড়ি ও আতঙ্ক আরো বেড়ে যায় এবং পদদলিত হয়ে কয়েকজন মারা যান। তবে আগুনের সময় রোগী ও স্বজনরা কয়েকটি গেটের তালা ভেঙে বের হন।

আগুন লিফটের কন্ট্রোল রুমে

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, নতুন ভবনের অষ্টম তলার ছাদে থাকা ১১ নম্বর লিফটের কন্ট্রোল রুমে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক যন্ত্র অতিরিক্ত গরম হওয়া অথবা শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

হাসপাতালের পুরোনো ও নতুন ভবনে মোট ১৫টি লিফট রয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের হিসাবে ১২টি সচল ও তিনটি অচল। তবে সরেজমিনে নতুন ভবনের পাঁচটি লিফটের মধ্যে চারটিই বন্ধ পাওয়া গেছে। সচল একটি লিফটের সামনে শতাধিক রোগী ও স্বজনকে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে মুমূর্ষু রোগী, শিশু, হুইলচেয়ারে থাকা রোগী ও অক্সিজেনের সিলিন্ডার বহনকারীরাও ছিলেন।

রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একাধিক লিফট বন্ধ থাকায় রোগীদের নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এমনকি অনেক সময় ওপরের তলায় রোগী মারা গেলেও লাশ নামানোর জন্য লিফট পাওয়া যায় না।

লিফটে আটকে পড়ার অভিযোগ

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাসপাতালের অনেক লিফটে অটোমেটিক রেসকিউ ডিভাইস (এআরডি) কার্যকর নেই। বিদ্যুৎ চলে গেলে এআরডি লিফটকে কাছের তলায় নিয়ে দরজা খোলার কথা। এটি কার্যকর না থাকলে বিদ্যুৎ বা যান্ত্রিক ত্রুটিতে লিফটে থাকা রোগী ও স্বজনরা আটকা পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন।

সম্প্রতি নতুন ভবনের একটি লিফট প্রায় ২৫ জন যাত্রী নিয়ে মাঝপথে প্রায় ৩০ মিনিট আটকে থাকার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এক ভুক্তভোগীর দাবি, গত এক সপ্তাহে তিনি তিনবার লিফটে আটকা পড়েছেন।

রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ নিয়েও প্রশ্ন

২০০৭ সাল থেকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ কার্যালয় টেন্ডারের মাধ্যমে হাসপাতালের লিফট রক্ষণাবেক্ষণের কাজ একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, ১৫টি লিফট দুই থেকে তিন শিফটে পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত অপারেটর থাকার কথা থাকলেও তা বাস্তবে নেই।

গত বছর ৩৫ থেকে ৪০ জন অপারেটরের বেতন বাবদ অর্থ বরাদ্দের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতি অপারেটরের জন্য মাসে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও একজন অপারেটর দাবি করেছেন, তিনি মাত্র সাত হাজার টাকা পান।

লিফট রক্ষণাবেক্ষণে বছরে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ থাকলেও অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে উত্তোলন এবং বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে যন্ত্রাংশ কেনার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এক হাজার শয্যায় রোগী সাড়ে ৪ হাজার

হাসপাতালটির আরেকটি বড় সমস্যা অতিরিক্ত রোগীর চাপ। এক হাজার শয্যার হাসপাতালটিতে গত সোমবার প্রায় চার হাজার ২০০ রোগী ভর্তি ছিলেন বলে জানিয়েছেন উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম। ফলে রোগীদের অনেককেই বারান্দা ও করিডোরে থাকতে হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন বহির্বিভাগসহ প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মানুষের চাপ থাকে। এত বিপুল মানুষের জন্য পর্যাপ্ত সিঁড়ি, লিফট, জরুরি বহির্গমন ও খোলা জায়গা না থাকায় অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগে বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি থেকে যায়।

মৃত্যুর কারণ নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য

অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পদদলিত হয়ে কেউ মারা যাননি বলা হলেও নিহতদের স্বজনেরা তা অস্বীকার করেছেন। কয়েকজন স্বজন দাবি করেছেন, আগুনের আতঙ্কে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় হুড়োহুড়ি ও পদদলিত হয়ে তাদের স্বজনদের মৃত্যু হয়েছে।

ফুলবাড়িয়ার শাহজাহান মোল্লার স্ত্রী হারিসা বেগম বলেন, আগুন লাগার পর তিনি ও তার বোন কাঁধে করে শাহজাহানকে সিঁড়ি দিয়ে নামানোর সময় পেছন থেকে ধাক্কায় পড়ে যান। এরপর মানুষের পায়ের নিচে চাপা পড়ে শাহজাহানের মৃত্যু হয়।

তারাকান্দার কুলসুমার ননদ নাজমা বেগমও দাবি করেন, নিচে নামার সময় পদদলিত হয়ে কুলসুমার মৃত্যু হয়েছে। পূর্বধলার হাজেরা বেগমের স্বজন রিপন মিয়াও একই ধরনের দাবি করেছেন।

ময়মনসিংহ জেলা জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ শেখ মোহাম্মদ ইউসুফ লিটন বলেন, তদন্তে শুধু আগুনের কারণ খুঁজলে হবে না। কেন চারটি সিঁড়ি তালাবদ্ধ ছিল, কেন পর্যাপ্ত লিফট সচল ছিল না, লিফটের নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর, রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে এবং পর্যাপ্ত অপারেটর ছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাসের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন