এআইয়ের ঢেউয়ের মুখোমুখি চীনা কর্মীরা

এআইয়ের ঢেউয়ের মুখোমুখি চীনা কর্মীরা
ছবি: এআই

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দ্রুত বদলে দিচ্ছে চীনের কর্মক্ষেত্র। কোথাও মানুষের কাজ সহজ করে দিচ্ছে এআই, কোথাও আবার কমিয়ে দিচ্ছে কাজের পরিধি। ফলে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হলেও চীনের বিপুলসংখ্যক কর্মী প্রযুক্তিটিকে ঠেকানোর বদলে সেটির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। চীনের কর্মীদের এই বাস্তবতা তাই অনেকটা ‘ডুবুন, নয়তো সাঁতার কাটুন’-এর মতো। এআইয়ের ঢেউ থামবে না; চাকরি ধরে রাখতে হলে সেই ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েই এগোতে হবে। সূত্র : দ্য স্ট্রিইটস টাইমস

সাংহাইয়ের বাণিজ্যিক মামলার আইনজীবী শিয়ে জিংইয়ি তাদেরই একজন। কাজের প্রয়োজনে তিনি নিয়মিত ডিপসিক ও দৌবাওয়ের মতো এআই টুল ব্যবহার করেন। আগে কোনো মামলার তথ্য খুঁজতে অনলাইন আইনি ডেটাবেসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত। এখন এআইয়ের সাহায্যে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কাছাকাছি ধরনের রায় ও তথ্য বের করে আনতে পারেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

তবে এআইয়ের দেওয়া তথ্য সব সময় নির্ভরযোগ্য নয়—এ কথাও তিনি জানেন। বিশেষ করে এআইয়ের তৈরি ভুল বা কাল্পনিক তথ্য নিয়ে তার সতর্কতা রয়েছে। তারপরও সময় ও শ্রম বাঁচানোর কারণে প্রযুক্তিটি তার কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

শিয়ে মনে করেন, এআই তার কিছু প্রচলিত কাজের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেবে। কিন্তু এর ফলে আইনজীবীদের পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়তে হবে—এমনটি তিনি মনে করেন না। বরং তথ্য খোঁজা বা অন্যান্য রুটিন কাজ এআই করে দিলে আইনজীবীরা কৌশল নির্ধারণ ও ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন।

চাকরি হারানোর ভয়ও আছে

দ্য স্ট্রিইটস টাইমস চীনের বিভিন্ন শহরের ৩০ জনের বেশি কর্মী ও চাকরিপ্রার্থীর সঙ্গে কথা বলেছে। বেইজিং, সাংহাই, চংকিং, শেনঝেন ও হংকংয়ের এসব মানুষের কেউ কাজ করেন পর্যটন খাতে, কেউ গণমাধ্যম; আইন, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বা বিপণনে।

তাদের অধিকাংশই এআইকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছেন না। বরং কাজের গতি ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করছেন। একইসঙ্গে এমন কিছু দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করছেন, যেগুলো এখনো এআই সহজে অনুকরণ করতে পারে না—যেমন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, নেতৃত্ব, কাস্টমার সার্ভিস ও কৌশল নির্ধারণ।

তবে উদ্বেগও কম নয়

নানজিংয়ের ৪০ বছর বয়সি সফটওয়্যার পরীক্ষক জোশুয়া ঝাং নিজের প্রতিষ্ঠানের তৈরি এআই মডেল ব্যবহার করে কাজ করেন। তার আশঙ্কা, যে প্রযুক্তি এখন তার কাজে সাহায্য করছে, ভবিষ্যতে সেটিই তার কাজের জায়গা দখল করতে পারে।

চীনের নানজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের গবেষক শি ঝেংডংও এআই নিয়ে উদ্বিগ্ন। তার মতে, প্রযুক্তির অগ্রগতি ঠেকানোর উপায় নেই। বরং এআই সমাজে বৈষম্য আরো বাড়াতে পারে—যারা আগে থেকেই সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন, তারা প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে আরো এগিয়ে যেতে পারেন।

এআইয়ের কারণে কিছু পেশায় চাপ বাড়ছে

চীনে এআই ও রোবটের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালে দেশটি বিশ্বের বাকি সব দেশের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি শিল্প রোবট স্থাপন করেছে বলে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ এআই ইনডেক্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বয়ংক্রিয় গাড়ি থেকে শুরু করে চ্যাটবট ও মানবসদৃশ রোবটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীন দ্রুত এগোচ্ছে। ২০২৫ সালে দেশটির স্বয়ংক্রিয় গাড়ি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বাইদুর অ্যাপোলো গো প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ সম্পূর্ণ চালকবিহীন যাত্রা পরিচালনা করেছে।

এআইয়ের এই দ্রুত বিস্তারের নেতিবাচক প্রভাবও দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালে বেইজিংয়ের চেউং কং গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব বিজনেসের প্রায় ১১,৮০০ কর্মজীবীর ওপর করা এক জরিপে ৮৫.৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করছেন, আগামী তিন বছরের মধ্যে এআইয়ের কারণে তাদের বেকার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

চীনের স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটকের অভিনেত্রী চেন ইউশির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়েছে। এআই দিয়ে ভিডিও তৈরির অ্যাপ জনপ্রিয় হওয়ার পর তার কাজ কমে যায়। পারিশ্রমিক কমিয়েও আগের তুলনায় অনেক কম কাজ পাচ্ছেন তিনি। তার সবচেয়ে বড় ভয়, ভবিষ্যতে এসব নাটকে মানুষের অভিনেতার প্রয়োজনই হয়তো থাকবে না।

নিজেদের দক্ষতা বাড়াচ্ছেন কর্মীরা

এআইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অনেক কর্মী এখন এমন দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করছেন, যেগুলো প্রযুক্তির পক্ষে সহজে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।

জেজিয়াং প্রদেশের ডিজাইনার মা ইয়ং দুই দশকের বেশি সময় ধরে ব্র্যান্ড ও প্যাকেজিংয়ের নকশা তৈরির কাজ করছেন। তার অনেক ক্লায়েন্ট এখন নিজেরাই এআই ব্যবহার করে পণ্যের নকশা, লেখালেখি ও ছোট ভিডিও তৈরি করছেন। তাই মা ইয়ংয়ের মতে, ডিজাইনারদের সামনে একটাই পথ—এআইকে ভয় না পেয়ে প্রযুক্তিটি কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ানো।

বেইজিংয়ের একজন সফটওয়্যার গবেষক ঝেং এআইকে তুলনা করেছেন শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে। তার মতে, প্রযুক্তি কিছু চাকরি বিলুপ্ত করবে, আবার নতুন ধরনের চাকরিও তৈরি করবে। যেমনÑঘোড়ার গাড়ির চালকদের একটি অংশ পরে গাড়িচালকের পেশায় চলে গিয়েছিলেন।

মানুষের যোগাযোগ এখনো বড় শক্তি

চীনের কর্মীরা মনে করছেন, এআই অনেক কাজ করতে পারলেও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি, নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা ও পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের গুরুত্ব এখনো অনেক।

বেইজিংয়ের দোভাষী লুও ইয়াং ১৯ বছর ধরে এই পেশায় আছেন। তার কাজের বড় অংশই মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। তাই এআই তার চাকরি পুরোপুরি নিয়ে নেবে বলে তিনি মনে করেন না।

একইভাবে সাংহাইয়ের ব্যবসা উন্নয়নকর্মী ক্যান্ডিস সানের কাছেও সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। এআই তার লিখিত কাজের গতি বাড়িয়েছে; কিন্তু ক্লায়েন্টের সঙ্গে মুখোমুখি সম্পর্ক তৈরি করার কাজটি এখনো তাকেই করতে হয়।

সরকারও চাকরি নিয়ে সতর্ক

এআই গ্রহণের ক্ষেত্রে চীনা সরকার জোরালোভাবে এগিয়ে গেলেও এর ফলে কর্মসংস্থানে কী প্রভাব পড়তে পারেÑতা নিয়েও সতর্ক রয়েছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেশটির মানবসম্পদ ও সামাজিক নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, কর্মসংস্থানে এআইয়ের প্রভাব মোকাবিলায় একটি নির্দেশিকা তৈরি করা হবে।

এদিকে এআইয়ের কারণে কোনো কর্মীর বেতন কমানো বা চাকরি বাতিল করা নিয়ে আদালতের রায়ও সামনে এসেছে।

হাংজৌয়ের একটি কোম্পানি এআই দিয়ে তার কাজ করা সম্ভব—এই যুক্তিতে ৩৫ বছর বয়সি এক প্রকল্প ব্যবস্থাপকের মাসিক বেতন ২৫ হাজার ইউয়ান থেকে কমিয়ে ১৫ হাজার ইউয়ান করার চেষ্টা করেছিল। কর্মী এতে রাজি না হওয়ায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে আদালত ওই চাকরিচ্যুতি অবৈধ ঘোষণা করে এবং কোম্পানিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

চীনা কর্তৃপক্ষের বার্তা হলো—প্রযুক্তিগত অগ্রগতি থামানো যাবে না; কিন্তু এআই গ্রহণের পুরো খরচ কর্মীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজন হলে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে এবং নতুন দায়িত্বে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।

এআইয়ের সঙ্গে লড়াই নয়, ব্যবহার করেই টিকে থাকার চেষ্টা

চীনের কর্মক্ষেত্রে এআইয়ের বিস্তার এখন আর ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাবনা নয়; এটি ইতোমধ্যে দৈনন্দিন কাজের অংশ হয়ে গেছে। গবেষণা, প্রতিবেদন তৈরি, ইমেইল লেখা, কোডিং, ভিডিও তৈরি থেকে শুরু করে গ্রাহকসেবা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মীরা নিয়মিত এআই ব্যবহার করছেন।

তবে একইসঙ্গে তারা বুঝতে পারছেন, শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করলেই হবে না। এআই যে কাজগুলো ভালো করতে পারে, সেগুলো প্রযুক্তির হাতে তুলে দিয়ে মানুষকে বরং এমন দক্ষতা বাড়াতে হবে, যেখানে মানুষের অভিজ্ঞতা, বিচারবোধ, নেতৃত্ব ও পারস্পরিক সম্পর্কের প্রয়োজন রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন