টুথপেস্ট বা অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক কিংবা ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি নিয়ে কোনো বেসরকারি সংস্থা গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের পূর্বে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাকে অবহিত করা এবং বিষয়টি যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা। একই সঙ্গে এ ধরনের গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট আইন বা নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ারও আহ্বান জানান তারা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওস্থ বিএসটিআই প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গণশুনানিতে বক্তারা এ দাবি জানান। গণশুনানিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএসটিআইর মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ড. মো. সাইফুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএসটিআইয়ের পরিচালক (প্রশাসন) মো. সাইফুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে স্কয়ার ফুড এন্ড বেভারেজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. পারভেজ সাইফুল ইসলাম, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের মার্কেটিং ডিরেক্টর কামরুজ্জামান কামাল, নেসলে বাংলাদেশের হেড অফ (আরএসএ) বিয়াসাদ জামান, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লি. এর জেনারেল ম্যানেজার (সাপ্লাই চেইন) মইন উদ্দিন আহমেদ খান, ট্রান্সকম কনজুমার প্রোডাক্টস এর (হেড অফ কিউএ, কিউসি এন্ড কমপ্লায়েন্স) মো. কামরুল হাসান, আকিজ রিসোর্স এর হেড অফ সাইস্টিফিক এন্ড রেগুলেটরি এ্যাফেয়ার্স মো. মেহেদি হাসান, নিউজিল্যান্ড ডেইরি বাংলাদেশ লি. এর ম্যানেজার (এসসিএম) আলী আকবর মজুমদার, এসিআই ফুড এন্ড বেভারেজ এর জেনারেল ম্যানেজার (প্রোডাকশন এন্ড কোয়ালিটি) মো. নাজিমুল ইসলামসহ ইউনিলিভার বাংলাদেশ, মেরিকো বাংলাদেশ লিমিটেড, মেঘনা গ্রুপ, রেকিট বেনকিজার, আরলা ফুডস বাংলাদেশ লিমিটেড, ইফাদ গ্রুপ, নাবিস্কো বিস্কিট, মেগা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন এবং বিএসটিআইয়ের সেবার মানোন্নয়ন ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরেন।
গণশুনানিতে বিএসটিআই মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হক বলেন, আমরা প্রতিটি গবেষণাকে মূল্যায়ন করি এবং অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করি। আমরা চাই দেশে বিভিন্ন বিষয়ে উন্নতমানের গবেষণা হোক। মানসম্পন্ন গবেষণা জাতিকে দিক-নির্দেশনা দিতে পারে। তবে এটাও খেয়াল রাখতে হবে জনমনে আতঙ্ক বা অস্থিরতা তৈরি হোক এমন কিছু যেন না হয়। টুথপেস্ট নিয়ে যে গবেষণা হয়েছে তার ফলাফল প্রকাশের পূর্বে রেগুলেটরি বডি হিসেবে বিএসটিআইকে অবহিত করলে নি:সন্দেহে ভালো হতো।
টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির বিষয়ে বিএসটিআই’র মহাপরিচালক (সচিব) আরো বলেন, এ বিষয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সারা পৃথিবীর কোনো স্ট্যান্ডার্ডে এর মাত্রা নির্ধারণ করা নেই। এ বিষয়ে আমাদের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হবে তারা আইএসওসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক মান যাচাই-বাছাইপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
স্কয়ার গ্রুপের লিগ্যাল এন্ড রেগুলেটরি এ্যাফেয়ার্স এর সিনিয়র লিগ্যাল কাউন্সেল মো. সোহেল হোসেন বলেন, টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বিষয়ে দেশে বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। টুথপেস্ট বিএসটিআই’র বাধ্যতামূলক মান সনদের অন্তর্ভুক্ত একটি পণ্য। কোনো বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে কোন গবেষণার ফলাফল প্রকাশের আগে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা তথা বিএসটিআইয়ের সাথে আলোচনা করা উচিত ছিলো। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণার ফলাফল সব সময় সঠিক বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে সম্পন্ন হয়েছে এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। ফলে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার সঙ্গে পূর্বেই বিষয়টি আলোচনা বা যাচাই করা হলে বিভ্রান্তি এড়ানো সম্ভব হবে। আলোচনার প্রেক্ষিতে নিশ্চিত হওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রকৃত তথ্য জনসম্মুখে উপস্থাপন করতে পারে। তা না হলে জনমনে বিভ্রান্তির পাশাপাশি ব্যাপক ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।
অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটিং এর উপদেষ্টা মো. শফিকুর রহমান ভুইয়া বলেন, সম্প্রতি একটি সংস্থা কয়েকটি বেকারি পণ্যে পটাশিয়াম ব্রোমেট পাওয়ার দাবি করেন যা দেশব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে বিএসটিআই’র এ্যাক্রেডিটেড ল্যাবরেটরি এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)-এর ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলোতে ওই উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। কিন্তু এ বিষয়ে নেতিবাচক প্রচারের ফলে ব্যবসায়ীর ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সুনামহানি যা হবার তা হয়ে গেছে, মানুষের মনে ওই পণ্য সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়ে গেছে। এটা ব্যবসার ক্ষেত্রে অপূরণীয় ক্ষতি।
তাদের মতে, এ ধরনের অসম্পূর্ণ বা যাচাইবিহীন তথ্য প্রকাশের ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা বা মিডিয়া ট্রায়াল সৃষ্টি হয়। ভোক্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ায় এবং প্রতিষ্ঠানের বাজার ও সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ গবেষণার দায় ব্যবসায়ীদের বহন করতে হয় যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
গণশুনানিতে শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা আরও বলেন, ভোক্তা সুরক্ষার পাশাপাশি শিল্পখাতের স্বার্থ রক্ষায় গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
অনুষ্ঠানে বিএসটিআই’র সেবা সহজীকরণে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, বিএসটিআইতে অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু, সব ধরনের আবেদন ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট অনলাইনে জমা দেওয়ার সুবিধা, নতুন পণ্যের পাশাপাশি লাইসেন্স নবায়নের আবেদনও সম্পূর্ণ অনলাইনে গ্রহণ, ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য গ্রোয়িং-আপ মিল্ক-এর ‘বাংলাদেশ মান’ প্রণয়ন এবং মোড়কজাত পণ্যের আইন ও বিধিমালার কয়েকটি ধারা সময়োপযোগী করার উদ্যোগ গ্রহণ করা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


