জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালনকারী ১৭ বছরের কিশোরী তাহরিমা জান্নাত সুরভির বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা দায়ের ও তদন্ত ছাড়াই তাকে রিমাণ্ডে পাঠানোর ঘটনায় দেশব্যাপী ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন মহলের ব্যাপক ক্ষোভের পর সন্ধ্যায় আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন। সোমবার দুপুরে গাজিপুর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সুরভীকে রিমাণ্ডে পাঠানোর আদেশ দেন। একইদিন সন্ধ্যায় আবার রিমান্ড বাতিল করে জামিন মঞ্জুর করেন।
এরআগে সুরভীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটিকে মিথ্যা ও প্রতারনামূলক দাবি করে সুরভীকে জামিন দেওয়ার আহ্বান জানান জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন সংগঠন। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নাম ভাঙিয়ে প্রতারনার দায়ে মামলার বাদি প্রতারক নাইমুর রহমান দূর্জয় ও তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
সুরভীর প্রতি অবিচার করা হয়েছে উল্লেখ করে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপাক ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, তিনি (সুরভী) ন্যায় বিচার পাবেন।
সুরভীর বিরুদ্ধে প্রতারক দূর্জয়ের মামলা
গাজিপুর আদালত সূত্র জানিয়েছে, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার নাইমুর রহমান দূর্জয় গত ১৮ নভেম্বর কালিয়াকৈর থানায় জুলাই কন্যা হিসেবে খ্যাত ১৭ বছরের কিশোরী সুরভীর বিরুদ্ধে একটি মামলা মামলা দায়ের করেন। এতে দূর্জয় দাবি করেন তার কাছ থেকে সৌরভী ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। এ ঘটনায় গত ২৫ ডিসেম্বর টঙ্গী পূর্ব থানার পুলিশ গভীর রাতে সৌরভীকে টঙ্গীর গোপালপুরের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে।
সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট সূত্র জানিয়েছে, নাইমুর রহমান দূর্জয় নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিলেও সে মূলত একটি প্রতারক। দেশ টিভির পরিচয় দিয়ে জুলাই আন্দোলনের সাহসী সাংবাদিক হিসেবে কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে ক্ষতিপূরণ নেয়। এ তার এ প্রতারণা ধরা পড়ার পর বাংলাদেশ প্রতিদিন কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরিচ্যুত করে। বর্তমানে সে দৈনিক কালবেলা মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় প্রতারণা করে আসছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নাম ভাঙ্গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রতারণা করেছে বলে জানিয়েছে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট।
প্রতারক দূর্জয় মামলা দায়েরের পর পুলিশের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম সৌরভীকে ৫০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার করার মিথ্যা সংবাদও প্রচার করে।
বিভিন্ন মহলের বিস্ময় প্রকাশ
এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের জিএস সালাউদ্দিন আম্মার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৌরভীর একটি ছবি দিয়ে লিখেছেন, ‘তিনি এখন জেলে আছেন। অভিযোগ ৫০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি। সংখ্যাটা শুনেই সন্দেহ জাগে। ৫০ কোটি! এই দেশেই যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয় কাগজে-কলমে, সেখানে একজন জুলাইয়ের রাজপথে থাকা তরুণীর বিরুদ্ধে হঠাৎ করে এমন অঙ্ক এটা কি সত্যিই বিচারিক অনুসন্ধানের ফল, নাকি ভয় দেখানোর রাজনৈতিক সংখ্যা?’
পাঁচটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন রেখে সেই ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেন, প্রশ্ন হলো ৫০ কোটি টাকার লেনদেনের প্রমাণ কোথায়? ব্যাংক ট্রান্সফার? মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল ট্রেইল? সাক্ষী? নাকি শুধু অভিযোগ আছে এই এক লাইনের ওপর ভর করেই জেল?
আদালতের রিমাণ্ড মঞ্জুরের পর ব্যাপক সমালোচনার ঝড় বয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। পাশাপাশি কথিত সাংবাদিক দূর্জয়ের বিভিন্ন অপরাধ, প্রতারণা ও অপকর্মের বিবরণ বেরিয়ে আসতে থাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সব শ্রেণী পেশার মানুষ দূর্জয়ের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানান।
প্রতারক ও কথিত সাংবাদিক দূর্জয় আমার দেশকে বলেন, আমি সৌরভীকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ক্ষমতার অপব্যবহার করিনি। উপদেষ্টার নামটিও কারো কাছে বলিনি। পুলিশ মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করেই ব্যবস্থা নিয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে দূর্জয় বলেন, আমি ৫০ হাজার টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা করেছি। ৫০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে আমি কোনো ভূমিকা রাখিনি। নিউজগুলো কে, কোথা থেকে কীভাবে ও কেনো করলো আমি বুঝতে পারিনি।
৫০ হাজার টাকার চাঁদাবাজির মামলায় ৭ দিনের রিমাণ্ডের আবেদন কোনো স্বাভাবিক ঘটনা কি না? পুলিশ কেনো এ আবেদন করলো? এমন প্রশ্নের জবাবে দূর্জয় বলেন, ‘এগুলোর জবাব পুলিশই ভালো দিতে পারবে।
এমন একটি মিথ্যা ও প্রতারণামূলক মামলায় ৭ দিনের রিমাণ্ডের আবেদন করা ন্যায়সঙ্গত হয়েছে কি না? এমন প্রশ্ন ছিলো মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওমর ফারুকের কাছে। তবে, এ বিষয়ে তিনি কিংবা থানা কর্তৃপক্ষ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক ফেজে লিখেছেন, ‘সৌরভীর বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ খবর নিয়েছি। ইনশাআল্লাহ, তিনি দ্রুত প্রতিকার পাবেন।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

