আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমানকে দুই দফা গুম করে রাখা হয়। ওই সময় ডিজিএফআই আয়নাঘরে জিজ্ঞাসাবাদে তাকে বলা হয়, কেন ২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে কথা বলেন। আওয়ামী লীগ-ভারত সম্পর্কে কেন নেতিবাচক লেখালেখি করেন সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। এছাড়াও কেন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের বিরুদ্ধে লেখালেখি করেন তাও জানতে চাওয়া হয়। সবশেষে জানানো হয়, শেখ হাসিনার নির্দেশে তাকে গুম করা হয়েছে; কথা না শুনলে গায়েব করে ফেলা হবে।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) বা আয়নাঘরে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও সাবেক-বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দিতে এসব কথা বলেছেন হাসিনুর রহমান।
জবানবন্দিতে লে. কর্নেল হাসিনুর রহমান বলেন, ২০১১ সালের ৯ জুলাই তাকে গুম করা হয়েছিল। তখন তিনি ময়মনসিংহ সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন। ওই দিন ঢাকা থেকে রাত ১০টায় কর্নেল হামিদ তার অফিসে যান। এরপর হামিদ তাকে জোর করে তুলে ঢাকায় অফিসার্স মেসে নিয়ে আসা হয়। পরে ডিজিএফআইয়ের ইন্টারোগেশন সেলে চোখ ও হাত বেঁধে ৪৩ দিন ফেলে রাখা হয়। এসময় তার পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি। তার বিরুদ্ধে হরকাতুল জিহাদ সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের মিথ্যা অভিযোগ এনে কোর্টমার্শাল করে চার বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে সেনাপ্রধান পরিবর্তন হলে ইকবাল করিম ভূঁইয়ার নির্দেশে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
জবানবন্দিতে হাসিনুর বলেন, ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট পুনরায় তাকে গুম আয়নাঘরে রাখা হয়। তাকে ১০/৮ ফিট একটি কক্ষে রাখা হয়। কক্ষটি ছিল স্যাঁতসেঁতে ও রক্তাক্ত। হাইভোল্টেজের আলো জ্বালিয়ে রাখা হতো। প্রচণ্ড গরমে তিনি হাঁসফাঁস করতেন। কক্ষটিতে একটি চৌকির ওপর একটা নোংরা রক্তাক্ত চাদর বিছানো ও দেয়ালে রক্ত দিয়ে ফোন নাম্বার লেখা ছিল।
জবানবন্দিতে হাসিনুর বলেন, সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে একজন অফিসার আসেন। তার কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছিল উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা। ওই অফিসার তার ফেসবুক আইডির বিষয়ে জানতে চান। তিনি জানান, ফেসবুক আইডি তার মনে নেই। তবে চাইলে তার বাসায় গিয়ে নিয়ে আসতে পারেন। এত খেপে গিয়ে তাকে বলেন, কেন সেনাপ্রধান আজিজের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে। এজন্য তাকে মেরে ফেলাসহ লাশ গুমের হুমকি দেন। পরে তার কাছে জানতে চাওয়া হয় এখন তিনি কোথায় আছেন। তিনি বলেন, ডিজিএফআইয়ের সদরদপ্তরে। তখন বলা হয় কিভাবে বুঝতে পারলেন এখানে আছেন। তখন পাশ থেকে একজন বলছিলেন, আপনি আয়নাঘরে আছেন। ওই সময় তাকে মারধর ও শুক দেওয়া হয়।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, নির্যাতনের ফলে তিনি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং কয়েকদিন অস্বাভাবিক আচরণ করেন। এরপর তিনি ওই অফিসারকে ডাকতে বলেন, কেন আটক রাখা হয়েছে তার কারণ জানতে চান। কিন্তু অফিসার আসেননি। তার প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে অনশন শুরু করেন। অনশনের সপ্তম দিনে অবস্থার অবনতি হলে আবার তাকে হাত, পা ও চোখ বেঁধে ওই অফিসারের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন তিনি তাকে জানান, তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কোনো অভিযোগ নেই, তবে নির্বাচনের আগে ছাড়া হবে না- এটুকু বলতে পারেন। তিনি আরও বলেন, ফেসবুকে আমার অনেক ফলোয়ার, অনেক অফিসারও আমার অনুগত। এই কারণে সরকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সেখান থেকে আবার আমার রুমে নিয়ে আসা হয় এবং আসার পথেও নির্যাতন করা হয়। তার যে কমপ্লেক্সে থাকতেন সেখানে ১০ ব্যবহারের জন্য দেড় ফুট লম্বা একটি গামছা ছিলো। যে কাপড় দিয়ে আমাদের চোখ বেঁধে রাখা হতো তা ছিলো অত্যন্ত নোংরা। যার ফলে তার দু’চোখে ইনফেকশন হয়ে যায়।
জবানবন্দিতে হাসিনুর বলেন, তিনি সেনাবাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তার কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে তিনটি পদক যথাক্রমে বীর প্রতীক, বাংলাদেশ রাইফেল পদক ও বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল পেয়েছেন। তার সঙ্গে সাধারণ সৈনিক দ্বারা এমন অমানবিক ও লজ্জাজনক আচরণ তিনি মেনে নিতে পারিনি। মানসিক চাপ ও শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে তার হার্ট এ্যাটাক হয়। এছাড়াও তার স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত ও তার তিন কন্যা সন্তান; সবার কথা চিন্তা করে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এসব কারণে একবার তার হার্ট অ্যাটাক হয়। এরপর তাকে বিল্ডিয়ের কোণার রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বড় বড় দুটি এডজাস্ট ফ্যান লাগানো ছিল। এ ফ্যানগুলো লাগানোর উদ্দেশ্য ছিলো যাতে ভিতরেকান্নার শব্দ ও চিৎকার না যায়। ওখানে ১০ টি রুম ছিলো। প্রত্যেক রুম থেকেই চিৎকার ও কান্নার আওয়াজ পাওয়া যেতো। প্রহরীদের পায়ের আওয়াজ শুনলে বন্দিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন- কখন কাকে নির্যাতন করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কাউকে কাউকে হত্যা করার জন্য র্যাবের নিকট হস্তান্তর করা হতো।
জবানবনিতে হাসিনুর বলেন, ২০১৮ সালের কোনো একদিন তাকে সকালে বাথরুমে নেওয়া হলে সেখানে ব্রিগেডিয়ার আজমিকে দেখে ফেলেন। বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে তাকে ওই রুম থেকে উল্টাদিকের আরেকটি রুমে স্থানান্তর করা হয়। প্রতিদিন রাতের বেলায় বিদ্যুৎ চলে যেত। জেনারেটর চালু করতে যে এক দেড় মিনিট সময় লাগতো ওই সময়টা তিনি রুমের সিসি ক্যামেরায় ময়লা লাগিয়ে দিতেন। এক পর্যায়ে সিসি ক্যামেরা নষ্ট হয়ে গেলে তা রিপেয়ার করার জন্য একজন টেকনিশিয়ান আনা হয়। তখন তাকে ব্রিগেডিয়ার আজমী যে কমপ্লেক্সে ছিলেন সেখানে একটি রুমে নেওয়া হয়। এই কমপ্লেক্সটি ছিলো বেশ পুরাতন। এর নিচ তলার উচ্চতা ছিলো ১৬ থেকে ১৮ ফিট। রুমটি দেখে তিনি বুঝতে পারেন যে এলাকায় আছি তা তার পরিচিত এলাকা। তিনি ১৯৯০ সালে ঢাকা আর্মি এমপি ইউনিটের অপারেশন অফিসার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। সেনানিবাসের সকল এলাকা তার পরিচিত। এটি যে ক্যান্টনমেন্ট তখন তিনি নিশ্চিত হন।
জবানবন্দিতে আরো বলেন, প্রহরীরা তাদেরকে সবসময় আতঙ্কের মধ্যে রাখত এবং বলত কথাবার্তা ঠিকমতো শুনেন নয়তো ক্রস ফায়ার হয়ে যাবেন। প্রায় সময় পার্শ্ববর্তী রুমগুলো খালি হয়ে যেতো। বন্দিদেরকে সরিয়ে ফেলা হতো। সেখানে নতুন বন্দি আনা হতো। প্রহরীরা তাদের বলতো যাদের কে নেওয়া হয়েছে তাদেরকে ক্রস ফায়ারের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে যে কমপ্লেক্সে রেখেছিল তাকে বলা হতো রিমান্ড সেল। অপ্রয়োজনীয় বন্দিদেরকে এই সেলে রাখা হতো। যখন প্রয়োজন হতো এখান থেকে নিয়ে ক্রস ফায়ার দেওয়া হত। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারির একদিন তিন ভোর ৪টার দিকে বাথরুমে গেলে সেখান থেকে বুটের শব্দ শুনতে পান। এরপর বাথরুমের একটি হোল দিয়ে কালো পোশাকধারী র্যাবের একজন সদস্যকে দেখেন। তার ধারণা তিনি হয়ত নতুন কাউকে দিয়ে যেতে অথবা আয়নাঘর থেকে কাউকে ক্রস ফায়ারের জন্য নিয়ে যেতে আসেন। জবানবন্দি অসম্পূর্ণ থাকায় বাকি অংশের জন্য দিন ধার্য করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

