আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

প্রত্যেককে আসল পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হবে: চিফ প্রসিকিউটর

যশোর অফিস

প্রত্যেককে আসল পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হবে: চিফ প্রসিকিউটর

বিচার, পুলিশি কার্যক্রম ও সমসাময়িক অন্যান্য প্রসঙ্গে অত্যন্ত কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। অ্যাটর্নি জেনারেল ৫ আগস্টের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বিচার কার্যক্রম নিয়ে তার অভিমত তুলে ধরেন। আর গণঅভ্যুত্থানে রাজনীতিক, আমলা, পুলিশের কাজের উদাহরণ দিয়ে এখন কীভাবে কার্যক্রম চালাতে হবে, সে সম্বন্ধে কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর। আজ যশোরে আয়োজিত কর্মশালায় তারা তাদের মনোভাব ও অবস্থান তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বিচারকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আইনের স্বাভাবিক নিয়ম হলো আদালত জামিন দেওয়ার একচ্ছত্র অধিকার রাখেন। এটা প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আইনজীবী হিসেবে বলবো, আদালতের জামিন দেওয়ার সেই একচ্ছত্র অধিকার নেই।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘আপনারা যারা এখানে বিচারক আছেন আপনাদের কাছে নিবেদন করবো, জেনারেল ডকট্রিন যেটা আপনারা অ্যাপ্লাই করেন, গায়েবি মামলার ক্ষেত্রে যে ডকট্রিন অ্যাপ্লাই করেছেন, যে মিথ্যা গায়েবি মামলা দায়ের করা হয়েছে, জামিন দিয়েছেন, তাহলে সেই তত্ত্ব এখন কেন প্রয়োগ করবেন না? আমরা বলছি, ওই গায়েবি মামলা এবং এই মামলা এক নয়। ফারুক সাহেবরা (জনৈক জজ) যখন জামিনের ফাইল নেবেন আপনি ৫ আগস্টের আগের অবস্থান এবং ৫ আগস্টের পরের অবস্থান এভিডেন্সগুলো বিবেচনায় নেবেন। এটা আমাদের নিবেদন আপনাদের কাছে।’

‘দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মানবাধিকার ও পরিবেশের ওপর গুরুত্বসহ আইন প্রয়োগ’ বিষয়ক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অ্যাটর্নি জেনারেল একথা বলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে ও যশোর জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আজ শনিবার শহরের পিটিআই মিলনায়তনে দিনব্যাপী এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এতে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশ কমিশনার, ১৬ জেলার জেলা ও দায়রা জজ, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, পাবলিক প্রসিকিউটর, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) ৩২০ জন কর্মকর্তা অংশ নেন।

কর্মশালায় অ্যাটর্নি জেনারেল বিচারকদের উদ্দেশে আরও বলেন, ‘আপনারা প্রজাতন্ত্রের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। সেই সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করতে গিয়ে প্রতিদিনই আপনাদের কলমের খোঁচায় নতুন নতুন জুরিসপ্রুডেন্স তৈরি হয়। আপনাদের দেখানো পথ ধরে আইনের অলিগলি চিহ্নিত হয়। আপনারা সেখানে যদি আগের সেই তত্ত্ব এফআইআরে নাম নাই পরবর্তীতে অ্যারেস্ট করেছেন সেই জায়গাটা আনেন, সেখানে আরেকটা বিষয় বিবেচনায় আনার কথা নিবেদন করবো, আপনারা মহামান্য আদালত, আপনাদের শ্রদ্ধার সাথে নিবেদন করতে পারি আমরা, আপনাদের কাছে নিবেদন এই যে, এফআইআরে যদি ১০০ জনকে আসামি করা হয়। আপনারা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করবেন।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা কেবল আইন ও সংবিধানের কাছে দায়বদ্ধ। কারও হুকুম মানতে বাধ্য নন। কিন্তু রাষ্ট্রের কিছু প্রায়োরিটি আছে। রাষ্ট্র একটা ট্রমার মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এসেছে মাত্র।’

তিনি বলেন, ‘যারা প্রতিবিপ্লব ঘটানোর চেষ্টা করছে, যারা বিভিন্ন জায়গায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে রাষ্ট্রকে স্টেবিলাইজ করার চেষ্টা করছে, এই সময় আপনারা যদি প্রোঅ্যাকটিভ না হন, এদেরকে যদি শক্তভাবে দমন করতে না পারেন তাহলে এই রাষ্ট্রকে আমরা ধরে রাখতে পারবো না।’

তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা অনেকটা যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আছি। এই মুহূর্তে যাদের দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা আছে, সবার আগে তাদের প্রতিহত করতে হবে। তাদের প্রত্যেককে ধরতে হবে বলে আমি মনে করি।’

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান কালে পুলিশের বর্বরতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকটা জায়গায় গুলি হয়েছে। এক যাত্রাবাড়িতেই ৪০০ থেকে ৫০০ পুলিশ পাগলের মতো গুলি করেছে। আমরা যদি সবাইকে গ্রেফতার করতাম তাহলে এই হলরুমের চারভাগের একভাগ থাকতো। বাকিদের গ্রেপ্তার হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। আমরা সেটা করিনি। আমরা যাচাই-বাছাই করে আলাপের মতো সাইকোপ্যাথ, সিরিয়াল কিলারকে গ্রেপ্তার করেছি।’

আয়নাঘরে অবর্ণনীয় নির্যাতনের প্রসঙ্গ বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘দৈত্য-দানবেরা আমাদের সন্তানদের বছরের পর বছর আটকে রেখেছে। তাদের কি বিচার হওয়া উচিত না? কিন্তু সেই বিচার করতে গিয়ে কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে হয়রানি করবো না। যারা অপরাধ করেছে তাদেরকে আইনের হাতে সোপর্দ করুন। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, সে যত বড় জেনারেল, আইজিপি, মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হোক না কেন। নিখুঁত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রত্যেককে আসল পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ জাতিসংঘ পেয়েছে। শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশে এটা হয়েছে। এটা (গণহত্যা) ছিল ওয়াইড স্প্রেড অ্যান্ড সিস্টেম্যাটিক। এমনটা কখন হয়? রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তির নির্দেশে এমনটা হয়।’

বাগেরহাটের একটি ঘটনার উল্লেখ করে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘সেখানে নারীদের অবরুদ্ধ করে হেনস্তা করার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। জেলা প্রশাসনের কাছে তথ্য চেয়েছিলাম। তারা বলেছে, এখানে এমন ঘটনা ঘটেনি। কেন এটা করেছেন? গুলি, হামলার প্রত্যেকটা তথ্য আমাদেরকে দেবেন। আমরা প্রমাণ করবো, গোটা বাংলাদেশজুড়ে একযোগে হামলা হয়েছে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়ে আপনি যদি সঠিক তথ্য না দেন, আপনাকে কিন্তু রাষ্ট্রের বন্ধু বিবেচনা করতে পারবো না।’

তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের অর্গানগুলো নানাভাবে আমাদের সাথে অসহযোগিতা করার চেষ্টা করেছে। আমরা ক্রমান্বয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছি। কতিপয় আমলার কাছে রাষ্ট্র জিম্মি হতে পারে না। হতে দেবো না।’

কর্মশালায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আতাউর রহমান খান, সিআইডির অতিরিক্ত আইজি মতিউর রহমান শেখ বক্তব্য রাখেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন