জুলাই গণহত্যা মামলা

জালিয়াতিতে জামিনে আসামিরা, বাদীকে প্রাণনাশের হুমকি

স্টাফ রিপোর্টার

জালিয়াতিতে জামিনে আসামিরা, বাদীকে প্রাণনাশের হুমকি

জুলাই আন্দোলনে ঘটে যাওয়া গণহত্যার সঙ্গে জড়িতরা এক শ্রেণির পুলিশ আর আদালত কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে জামিনে বেরিয়ে আসছে। বীরদর্পে এলাকায় ফিরে প্রকাশ্যে বৈষম্যবিরোধী হতাহত ছাত্রদের পরিবারগুলোকে ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।

গতকাল সোমবার ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তথ্য গোপন এবং জালিয়াতির মাধ্যমে কুখ্যাত লীগ সন্ত্রাসীদের জামিনে বেরিয়ে আসার ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টরা জানান, ছাত্র-জনতার আন্দোলন যখন তুঙ্গে, আগস্টের ৪ তারিখ আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্থানীয় অন্যতম সমন্বয়ক রবিউসসানী শিপু ফ্যাসিস্টবিরোধী মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় পুলিশ এবং লীগ সন্ত্রাসীদের এলোপাতাড়ি গুলিতে মারাত্মক আহত হন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী শাহিন মণ্ডল আমার দেশকে বলেন, ওই মামলাটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা। মামলায় আসামি ১৪ জন। তার মধ্যে সাত আসামি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ঢাকা থেকে জামিন লাভ করে এই বিবেচনায় যে, আসামিরা বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের সদস্য এবং প্রমাণ হিসেবে কিছু ভুয়া ছবি ও কাগজ আদালতে দাখিল করা হয়।

কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেছে, ওই মামলার ৭ নম্বর আসামি হাবিবুর রহমান আওয়ামী হকার্স লীগের আশুলিয়া থানা কমিটির পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক, পাঁচ নম্বর আসামি জহিরুল ইসলাম আওয়ামী হকার্স লীগ আশুলিয়া থানা কমিটির কার্যকরী সম্পাদক, ১৪ নম্বর আসামি লিমা আক্তার একই কমিটির মহিলাবিষয়ক সম্পাদক, ১৩ নম্বর আসামি মো. মাসুদ একই কমিটির সমবায়বিষয়ক সম্পাদক। তারা প্রতারণামূলকভাবে মিথ্যা তথ্য দাখিল করে জামিনে বেরিয়ে এসে বাদী ও ভিকটিমকে মামলাটি উঠিয়ে নেওয়ার জন্য ক্রমাগত হুমকি দিয়ে আসছে।

আর এ মামলাটির এক নম্বর আসামি মেহেদী হাসান হিরো, দুই নম্বর আসামি মো. শান্ত, তিন নম্বর আসামি রহিমের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩২৬, ৩০৭ ধারাসহ অজামিনযোগ্য ধারায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ঢাকা এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকায় বারবার আসামিদের জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হচ্ছিল।

কিন্তু গত ২১ জানুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ হতে ১নং, ২নং ও ৩নং আসামি অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়ে যায়। হাইকোর্টে আসামিদের পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট বিপ্লব কুমার দাস।

হাইকোর্টের এ অন্তর্বর্তী জামিনকে স্থায়ী জামিন হিসেবে লিখে দিয়ে আদালতে গতকাল সোমবার কাগজ উপস্থাপন করা হয়। আশুলিয়া অঞ্চলের জজকোর্টের জিআরও এএসআই খায়ের এ কাজটি করেন, যা তিনি আমার দেশ-এর কাছে স্বীকার করেন।

ফলে আসামিরা সবাই জামিন পেয়ে যায়। আদালত থেকে জামিন লাভের পর আসামিরা বাদী ও মামলার ভিকটিমকে ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। ফলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত ছাত্র রবিউস সানি ও তার মা স্কুলশিক্ষিকা আশুলিয়া থানায় ইতোমধ্যে একটি জিডি করেন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিরাপত্তা চেয়েছেন।

এখানে আরও রহস্যময় ব্যাপার হচ্ছে, গতকাল সোমবার মামলাটির শুনানির দিনেও বিগত সময়ে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জামিনের আদেশটি এবং উচ্চ আদালতের রায়টি মূল মামলার নথিতে কৌশলে সংযুক্ত করা হয়নি।

গতকাল ওই মামলাটির ধার্য তারিখ থাকায় মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী আসামিদের জামিন বাতিল করার আবেদন প্রদান করার সময় লক্ষ করেন যে, ১ নম্বর, ২ নম্বর ও ৩ নম্বর আসামিকে হাজতি আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। সুতরাং আইনগত কারণে বাদীপক্ষের আইনজীবী এক থেকে তিন নম্বর আসামির জামিন বাতিলের আবেদন করতে পারেননি।

কিন্তু পরবর্তীতে মামলাটির শুনানি শেষ হয়ে যাওয়ার পর ধরা পড়ে যে, ১ নম্বর, ২ নম্বর ও ৩ নম্বর আসামির জামিনের আদেশ এবং উচ্চ আদালতের জামিনের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ নথিতে তখন সংযুক্ত করা হয়েছে। বাদীপক্ষের আইনজীবী জানান, এক থেকে তিন নম্বর আসামিকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে আশুলিয়া জিআর শাখার কর্মকর্তারা কৌশলে ওই ঘটনা ঘটান এবং বাদীকে আইনগত পদক্ষেপ নিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন, যা ব্যাপক জালিয়াতির শামিল।

এ ব্যাপারে আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিএসআই ইন্সপেক্টর হারুন জানান, বিষয়টি তিনি ভালোভাবে অবগত নন। ভবিষ্যতে আরো সতর্ক থাকবেন।

ওই মামলার বাদী রবিউস সানির মা স্কুলশিক্ষিকা নাদিয়া আফরোজ শিউলি আমার দেশকে বলেন, আমি একজন বিধবা। আমার ছেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় এবং পরবর্তী মামলাটি দায়েরের পর থেকেই তিনি নানামুখী চাপে আছেন। মামলার সব আসামি বর্তমানে জামিনে আছে, বিশেষ করে ১নং থেকে ৩নং আসামি জামিনে মুক্তিলাভের পর তিনি আরো চাপের মধ্যে রয়েছেন। আসামিরা এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং মারাত্মক অপরাধী।

তাদের নামে ইতোমধ্যে আশুলিয়া থানায় অনেকগুলো মামলা রয়েছে। আসামিরা তার পরিবার ও ভিকটিমকে ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার ও প্রশাসনের সহযোগিতা না পেলে এলাকা ছেড়ে হয়তো অন্যত্র চলে যাওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় থাকবে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

বিষয়:

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...