বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) রেজিস্ট্রার ড. হারুন অর রশিদের নিয়োগ বাতিল নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলী নিজেকে বাঁচাতে রেজিস্ট্রার হারুনকে কোনো কারণ ছাড়াই অব্যাহতি দিয়েছেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ছুটির পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরদিনই জামায়াতপন্থি আখ্যা দিয়ে রেজিস্ট্রার হারুনের নিয়োগ বাতিল করা হয়। গত সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২০তম সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশকে বলেন, উপাচার্য শওকত আলী নিজেকে বাঁচাতে রেজিস্ট্রার হারুন অর রশিদকে কোনো কারণ ছাড়াই অব্যাহতি দিয়েছেন।
সম্প্রতি বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সঙ্গে আঁতাত করে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকরা ভিসি এবং রেজিস্ট্রারকে জামাতপন্থি আখ্যা দিয়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যমে লেখালেখি শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের মতো ভিসিকে জামায়াত ট্যাগ দিয়ে সামাজিকমাধ্যমে লেখালেখি শুরু করেন। এতে ভিসি ভয় পেয়ে নিজের পদ বাঁচাতে রেজিস্ট্রার হারুনকে কোনো কারণ ছাড়াই অব্যাহতি দেন।
তারা জানান, রেজিস্ট্রার হারুন অর রশিদ নামাজি-পরহেজগার এবং সৎভাবে জীবনযাপন করা মানুষ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগের পর একাধিক ভুয়া নিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেন। অনিয়ম এবং জাল সনদে চাকরি নেওয়ার বিষয়টি প্রমাণ হওয়ায় ইতোমধ্যে কয়েকজনের চাকরি যায়। আরো বেশ কয়েকজন চাকরি যাওয়ার ঝুঁকিতে আছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বাদী হয়ে কেউ মামলা করার সাহস পাননি। তখন রেজিস্ট্রার হারুন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে আবু সাঈদের হত্যাকারীদের বিচার চেয়ে মামলা করেন। মামলায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-কর্মচারী এবং পুলিশ কর্মকর্তাসহ অনেককে আসামি করা হয়। বর্তমানে মামলাটি চলমান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক ও কর্মকর্তা বলেন, ভুয়া কাগজপত্রে নিয়োগ পাওয়া কতিপয় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং মামলার আসামিরা একত্রিত হয়ে অনেক আগে থেকেই রেজিস্ট্রারের পেছনে লেগেছিলেন। ভিসি চাইলে রেজিস্ট্রারকে রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা না করে নিজেকে বাঁচিয়েছেন। রেজিস্ট্রার চলে যাওয়ায় জাল সনদধারী ও মামলার আসামিরা এখন হাততালি দিয়ে হাসছেন।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী রেজিস্ট্রার হারুন অর রশিদ বলেন, বেরোবিতে রেজিস্ট্রার হিসেবে ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর আমার নিয়োগ হয়। আমি নিয়োগ পেয়ে ফাইলপত্র হাতে নিয়ে দেখি ২৫-২৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শিক্ষক ভুয়া কাগজপত্রে যোগদান করে দিব্যি চাকরি করছেন। ২০১২ সালে অনেকে যোগ্যতা ছাড়াই সপ্তম গ্রেডে সরাসরি যোগদান করেন, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। বিষয়গুলোরে বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করি। কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। কয়েকজনের চাকরিও চলে গেছে। ভুয়া নিয়োগ এবং জাল সার্টিফিকেট যাচাইয়ের জন্য তদন্ত কমিটি করা হয়, যেখানে আমিও আছি। এতে যাচাইকালে গণসংযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষকসহ কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষকের সার্টিফিকেটে ঘষামাজা পাওয়া যায়। তারাও আমার প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
তিনি বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সুপারিশ করায় তখন থেকে আমাকে নানা ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি দেওয়া হয়। কিন্তু আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে সততায় আস্থা রেখে কাজ চালিয়ে যেতে থাকি।
হারুন অর রশিদ বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ প্রকাশ্যে পুলিশের গুলিতে নিহত যাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষে একটি মামলা করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কেউ বাদী হওয়ার সাহস পাচ্ছিলেন না। আমি বাদী হয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নাম উল্লেখ করে মামলা করি। মামলার পর তারা আমাকে ভয়ভীতি দেখানোর পাশাপাশি ক্ষতি করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকেন।
বিষয়গুলো তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ প্রশাসনকে জানান উল্লেখ করে হারুন অর রশিদ আরো বলেন, মামলার আসামি ও আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষকরা বিএনপিপন্থি শিক্ষক এবং ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে আমাকে সরানোর জোর তৎপরতা চালান। তারা ভিসি এবং আমাকে জামায়াতপন্থি ট্যাগ দিয়ে পদত্যাগ দাবি করেন। এতে ভিসি ভয় পেয়ে বিএনপির হাইকমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাকে অব্যাহতি দিয়েছেন।
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আমি যেভাবে জাল সনদধারী ও অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছিলাম, এতে আমার শত্রু বাড়া শুরু করেছিল। বিষয়গুলো ভিসি জানতেন। ভিসি ইচ্ছা করলে আমাকে অব্যাহতি না দিলেও পারতেন। কিন্তু তিনি নিজে বাঁচার জন্য ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে মারাত্মক ভুল করেছেন। তিনি নিজেই জানেন এখানে অনেকে জাল সনদে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করছেন। ভুয়া নিয়োগ এবং অর্থ তছরুপ করার কারণে সাবেক ভিসি আব্দুল জলিল জেল খাটার পাশাপাশি মামলায় ঝুলছেন।
এ বিষয়ে ভিসি শওকত আলী বলেন, তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাই আপাতত চুক্তি বাতিল করে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

