বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে কবি আল মাহমুদকে চরমভাবে উপেক্ষা ও প্রান্তিক করা হয়েছে- এমন অভিযোগ উঠে এসেছে তার ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণসভা থেকে। বক্তারা বলেন, দীর্ঘ ১৫ থেকে ১৭ বছর ধরে আল মাহমুদ কার্যত নিষিদ্ধ ছিলেন; তার সাহিত্যচর্চাকারীদের বিভিন্নভাবে ‘ট্যাগ’ দিয়ে দমন করা হয়েছে।
রোববার কবি আল মাহমুদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তার নামে নির্ধারিত ‘আল মাহমুদ কর্নার’-এ স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আল মাহমুদ কেন্দ্রিক সংগঠন কালের কলস।
বিকেল ৪টায় শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ কবির ভক্ত-অনুরাগীরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে কবি আল মাহমুদের কবিতার পংক্তি আবৃত্তির মাধ্যমে তাকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হয়ে সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থান- বাংলা জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতিটি বিপ্লবী পর্যায়ে আল মাহমুদের কবিতা মুক্তিকামী মানুষকে প্রেরণা যুগিয়েছে। দ্রোহ, প্রেম, প্রকৃতি ও প্রার্থনার এক অনন্য সমন্বয়ে তিনি বাংলা কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
কালের কলসের সম্পাদক আবিদ আজম বলেন, আল মাহমুদ কোনো নির্দিষ্ট দল বা মতাদর্শের কবি নন। তিনি সমগ্র জাতির কবি। অথচ রাজনৈতিক বিবেচনায় তাকে দীর্ঘদিন অবহেলার মধ্যে রাখা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে এবং আল মাহমুদের কবিতা পুনরায় পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
স্মরণসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘের সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি ড. আবুল কাসেম শেখ। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, আল মাহমুদের সাহিত্যকর্মকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, কবির নামে কোনো ইনস্টিটিউট বা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় ইউনেস্কো ও জাতিসংঘের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও অর্থায়নের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা আল মাহমুদের স্মৃতিরক্ষার্থে বেশ কয়েকটি দাবি উত্থাপন করেন। এর মধ্যে রয়েছে- নজরুল ইনস্টিটিউটের আদলে ‘কবি আল মাহমুদ ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা, বাংলা একাডেমিতে তার নামে একটি স্বতন্ত্র ভবন বা ‘আল মাহমুদ অডিটোরিয়াম’ নির্মাণ, জাতীয় পর্যায়ে তার সাহিত্যচর্চা জোরদার করা এবং তার রচনাবলি সংরক্ষণের জন্য একটি জাতীয় আর্কাইভ বা লাইব্রেরি গড়ে তোলা।
কবি শাহিন রেজা তার বক্তব্যে আল মাহমুদকে ‘বাংলা কবিতার মুকুটমণি’ আখ্যা দিয়ে বলেন, প্রতিকূল রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও তিনি কীভাবে আল মাহমুদ উৎসব আয়োজন করেছেন, তা আজ ইতিহাস। তিনি কবির সততা, ঈমান ও কবিতার আধ্যাত্মিক শক্তির কথা তুলে ধরেন।
বক্তব্যে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং আল মাহমুদকে তার পিতার পর সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে আবৃত্তিশিল্পী মাহবুবুল কবির আল মাহমুদের জনপ্রিয় কবিতা ‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’ আবৃত্তি করেন। পরে চলচ্চিত্র নির্মাতা পার্থিব রাশেদ বলেন, আল মাহমুদের কবিতায় একসঙ্গে বামপন্থা, দেশপ্রেম ও ইসলামের নান্দনিক সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটেছে। তিনি কবির আত্মজীবনী অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের আগ্রহও প্রকাশ করেন।
আলোচনা সভা শেষে কবি আল মাহমুদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে এবং তার সাহিত্যকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান উপস্থিত অতিথিবৃন্দ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

