মানারাত স্টেম ফেস্টে পুরস্কৃত খুদে বিজ্ঞানীরা, উদ্ভাবনে মানবকল্যাণের বার্তা

মানারাত স্টেম ফেস্টে পুরস্কৃত খুদে বিজ্ঞানীরা, উদ্ভাবনে মানবকল্যাণের বার্তা

কেউ তৈরি করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর স্মার্ট চশমা, কেউ বানিয়েছে রোবটিক হাত, আবার কেউ নদী ও জলাশয় থেকে বর্জ্য অপসারণের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চেষ্টা করেছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দৈনন্দিন জীবন সহজ করা থেকে শুরু করে পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার—বিভিন্ন বাস্তব সমস্যার সমাধানে নিজেদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে খুদে বিজ্ঞানীরা।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষার্থীদের এমন সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের স্বীকৃতি দিতে পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে রাজধানীর মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের (এমডিআইসি) দুই দিনব্যাপী ‘এমডিআইসি স্টেম ফেস্ট ২০২৬-২৭’। শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে কলেজ ক্যাম্পাসে আয়োজিত সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক এ উৎসবে রাজধানী ও আশপাশের প্রায় ৮৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আট শতাধিক প্রতিযোগী অংশ নেয়। শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্কতা, সৃজনশীল চিন্তা, উদ্ভাবনী দক্ষতা এবং বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে মানারাত ক্লাবস ফর কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজের (এমসিসিএ) অধীনে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়।

Amardesh_Manarat school

উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী প্রকল্প প্রদর্শনী। তৃতীয় থেকে পঞ্চম, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম এবং নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য তিনটি বিভাগে এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এতে রোবোটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন প্রকল্প উপস্থাপন করে প্রতিযোগী দলগুলো।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দৈনন্দিন জীবন সহজ করার লক্ষ্যে শিক্ষার্থী মাহিমা আহমেদ ও তাঁর দলের তৈরি ‘রোবটিক হ্যান্ড’ এবং ‘ব্লাইন্ড ম্যান হেল্পার’ প্রকল্প দুটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

রোবটিক হ্যান্ড প্রকল্পে মোটর, সার্কিট বোর্ড ও থ্রিডি প্রিন্টেড পাঁচটি আঙুল ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে, ব্লাইন্ড ম্যান হেল্পার প্রকল্পে প্রক্সিমিটি সেন্সর ও আরডুইনো ন্যানোর সাহায্যে সামনের বাধা শনাক্ত করে শব্দের মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে সতর্ক করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি মানুষের চলাচল এবং দৈনন্দিন কাজকে সহজ করার সম্ভাবনা তুলে ধরে।

পরিবেশ সংরক্ষণে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তার আরেকটি উদাহরণ ‘সার্কুলার ব্লু’। নদী ও জলাশয় থেকে বর্জ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তৈরি এ ভাসমান প্ল্যাটফর্মে ডিসি মোটর, সার্ভো মোটর ও আরডুইনো ন্যানো ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রযুক্তিনির্ভর এ উদ্যোগের মাধ্যমে জলাশয়ের বর্জ্য অপসারণের সম্ভাবনা তুলে ধরে শিক্ষার্থীরা পরিবেশদূষণ মোকাবিলায় নিজেদের চিন্তার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। নদী ও জলাশয়কে দূষণমুক্ত রাখতে প্রযুক্তির ব্যবহার কীভাবে সহায়ক হতে পারে, প্রকল্পটি সেই ধারণাকে সামনে নিয়ে আসে।

এ ছাড়া ‘ককলিয়া ক্যাপ’, ‘সায়ার-ডিজিটাল রিসাইক্লার’, ‘টিম কার্বন ফাইটার’, ‘অমনিঅ্যাক্সিস’, ‘গ্লেন ব্লেজ রেসার্স’, ‘টেক টাইটানস’ ও ‘নিনজা সেভার্স অব দ্য নেচার’সহ বিভিন্ন দলের প্রকল্পে চিকিৎসা প্রযুক্তি, পুনর্ব্যবহার, পরিবেশ সুরক্ষা ও আধুনিক প্রযুক্তির নানা দিক উঠে আসে।

Amardesh_Manarat

স্টেম ফেস্টের আহ্বায়ক ও মানারাত সায়েন্স ক্লাবের ইনচার্জ ড. মো. মাকসুদুল আলম বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), জলবায়ু পরিবর্তন ও চিকিৎসা ক্ষেত্রের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের চিরাচরিত শিক্ষার বাইরে গিয়ে সমস্যা সমাধানের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, স্টেম কেবল বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত—এই চারটি বিষয়ের পাঠদান নয়; বরং এটি কৌতূহল, নতুন কিছু চেষ্টা করার সাহস এবং ধাপে ধাপে শেখার একটি বিশেষ মানসিকতা। বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে এগিয়ে নিতে শিক্ষার্থীদের এখন থেকেই প্রস্তুত হতে হবে।

মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল স. ম. মাহবুব উল আলম, ওএসজি, এসজিপি, এনডিসি, পিএসসি (অব.) বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাদের বিজ্ঞানমনস্কতা, সৃজনশীল চিন্তাভাবনা, উদ্ভাবনী দক্ষতা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের নতুন কিছু শেখার, নিজেদের মেধা বিকাশের এবং ভবিষ্যতে নতুন উদ্ভাবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

অধ্যক্ষ বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা বর্তমানের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে পারে। তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, দূরদর্শিতা এবং মানবকল্যাণে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

Amardesh_Manarat school.

মানারাত ট্রাস্টের একাডেমিক কমিটির আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোজাম্মেল হক বলেন, স্টেম ফেস্ট শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বাস্তব উদ্ভাবনে রূপ দেওয়ার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক কৌতূহল, বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি, নেতৃত্ব ও দলগত কাজের দক্ষতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তিনি বলেন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতের সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আগামী দিনের উদ্ভাবক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও জীবপ্রযুক্তির সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি এসব প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ও জীবসম্পদ কাজে লাগিয়ে নতুন উদ্ভাবন, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরিতে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান অধ্যাপক ড. মোজাম্মেল হক।

উৎসবের সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) ও আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফজলে ইলাহী।

তিনি বলেন, দেশের উন্নয়নে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ে দক্ষ গ্র্যাজুয়েটদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। চীনের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামরিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিকতা, চরিত্র গঠন ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়েও সচেতন হতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও জীবপ্রযুক্তির মতো আধুনিক প্রযুক্তির সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে।

Amardesh_Manarat.

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফজলে ইলাহী স্টেম ফেস্টকে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা, নেতৃত্ব ও বাস্তবমুখী দক্ষতা বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে এ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত সায়েন্স ক্লাব, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথিদের বক্তব্যেও বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। পরিবেশবিজ্ঞান, জলবায়ুবিদ্যা ও আবহাওয়াবিদ্যাসহ বিভিন্ন শাখায় গবেষণা সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান বক্তারা।

তাঁরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জ্ঞানকে বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে কাজে লাগানোর পাশাপাশি গবেষণার প্রতি আগ্রহ, দায়িত্বশীল মনোভাব এবং সামাজিক কল্যাণে অবদান রাখার মানসিকতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।

অলিম্পিয়াড, রোবোটিকস ও নানা প্রতিযোগিতায় মুখর উৎসব

দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনে প্রথম দিন গণিত, সাধারণ বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি ছিল রোবোটিকস, মাইনক্রাফটভিত্তিক কার্যক্রম এবং ট্রেজার হান্ট।

দ্বিতীয় দিন অনুষ্ঠিত হয় কম্পিউটার সায়েন্স অলিম্পিয়াড ও মাইনক্রাফটভিত্তিক কার্যক্রম। এদিন শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী প্রকল্প প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর নানা ধারণা তুলে ধরা হয়। পরে সমাপনী অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণের মাধ্যমে উৎসবের পর্দা নামে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল মো. আনোয়ারুল করীম, অধ্যাপক তাহমীনা ইয়াসমীন, বালক শাখার কো-অর্ডিনেটর মহসীন কোরাইশী, স্টেম ফেস্টের বালিকা শাখার আহ্বায়ক রোকসানা খানমসহ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী প্রকল্প, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও বাস্তব সমস্যার সমাধানভিত্তিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে এমডিআইসি স্টেম ফেস্ট ২০২৬-২৭ শুধু একটি প্রতিযোগিতামূলক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে ব্যবহারের সম্ভাবনাও তুলে ধরেছে। খুদে বিজ্ঞানীদের এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতে গবেষণা, উদ্ভাবন ও দেশের উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি করবে—এমন প্রত্যাশা আয়োজক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন