আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

গ্রন্থাগারে পাঠকশূন্যতা তলানিতে পাঠাভ্যাস

মাহির কাইয়ুম, ঢাবি

গ্রন্থাগারে পাঠকশূন্যতা তলানিতে পাঠাভ্যাস

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার দেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারগুলোর মধ্যে একটি। যেখানে এক সময় আসনের জন্য ফজরের পর থেকেই শিক্ষার্থীদের লাইন ধরতে হতো কিন্তু এখন দিনের যেকোনো সময় এলেই মিলছে ফাঁকা চেয়ার। আজ জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য যেন দেশের সামগ্রিক পাঠাভ্যাসের অবনতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

চাকরিমুখী পড়াশোনা, গৎবাঁধা একাডেমিক সিলেবাস, স্মার্টফোননির্ভর বিনোদন এবং রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাবে বাংলাদেশে বই পড়ার সংস্কৃতি ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের ২০২৪ সালের পাঠাভ্যাস জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বের ১০২টি দেশের মধ্যে বই পড়ায় বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। একজন বাংলাদেশি গড়ে বছরে মাত্র ৬২ ঘণ্টা বই পড়েন, যা সংখ্যার হিসাবে তিনটিরও কম বই।

বিজ্ঞাপন

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান তালিকার একেবারে নিচের দিকে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস পর্যবেক্ষণ করলে এ সংকট আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এ প্রতিবেদক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এএফ রহমান হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, বিজয় একাত্তর হল ও ফজলুল হক মুসলিম হলসহ কয়েকটি হলে শতাধিক শিক্ষার্থীর পড়ার টেবিল পর্যবেক্ষণ করেন। দেখা যায়, অধিকাংশ টেবিলে চাকরির প্রস্তুতির বই ও একাডেমিক লেকচার শিট ছাড়া তেমন কোনো বই নেই। যাদের টেবিলে পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পাওয়া গেছে, সেগুলোর সংখ্যাও ১০ থেকে ২০টির বেশি নয়। জ্ঞানচর্চার জন্য প্রয়োজনীয় সাহিত্য, দর্শন বা ইতিহাসভিত্তিক বই পড়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট অনীহা লক্ষ করা গেছে।

স্যার এএফ রহমান হলের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই চাকরির চিন্তা শিক্ষার্থীদের তাড়িয়ে বেড়ায়। ফলে একাডেমিক ও চাকরির বইয়ের বাইরে পড়ার সুযোগ খুব কমই হয়।

দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই কার্যকর গ্রন্থাগারের অভাব রয়েছে। পুরোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গ্রন্থাগার এক সময় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মিলনকেন্দ্র হলেও বর্তমানে অনেকটাই নিষ্প্রাণ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে গ্রন্থাগার প্রায়ই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পরিসংখ্যানও বদলে যাওয়া বাস্তবতার সাক্ষ্য দেয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রন্থাগারের পাঠক সেবা বিভাগে প্রতি মাসে গড়ে মাত্র ২০০ থেকে ৪০০টি বই ইস্যু হয়েছে। অথচ এ গ্রন্থাগারে রয়েছে ছয় থেকে প্রায় নয় লাখ বই ও জার্নালের বিশাল সংগ্রহ। পাশাপাশি সংরক্ষিত আছে প্রায় ৩০ হাজার বিরল পাণ্ডুলিপি, মাইক্রোফিল্ম ও সিডি। প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাসে মাত্র ৪০০টি বই পাঠকের হাতে যাওয়া পাঠাভ্যাস নিয়ে নতুন করে ভাবার ইঙ্গিত দেয়।

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্স সমাপনী বর্ষের শিক্ষার্থী হামিদুর রহমান বলেন, প্রথম বর্ষে থাকাকালে ফজরের পরই লাইব্রেরিতে ব্যাগ রেখে আসতে হতো। এখন দুপুরে গেলেও সহজে জায়গা পাওয়া যায়। অনেকেই লাইব্রেরিতে এসে বই না পড়ে ফোন চালায়, মুভি দেখে কিংবা ঘুমায়।

বাংলামোটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের গ্রন্থাগারিক জাহিদ হোসেন বলেন, শিশুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় দিচ্ছে কিন্তু বইয়ের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে না। এমনকি শিক্ষিত পরিবারেও এখন বইয়ের আলমারি বিরল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, পাঠাভ্যাসে অবনতির বড় কারণ রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা। দীর্ঘদিন ধরে পাঠাভ্যাস নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের কোনো জরিপ বা গবেষণা হয়নি। ফলে সমস্যার গভীরতা অনুধাবন করা যাচ্ছে না।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, আমাদের সামাজিক সংস্কৃতিতে বই পড়ার তেমন কদর নেই। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ও গৎবাঁধা সিলেবাস পাঠাভ্যাস গড়ে ওঠার পথে বড় বাধা। তিনি বলেন, পাঠাভ্যাস ফেরাতে হলে রাষ্ট্রকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। মানসম্মত শিক্ষা, যুগোপযোগী সিলেবাস ও শক্তিশালী গ্রন্থাগারব্যবস্থা ছাড়া জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসে তাই প্রশ্নটি আরো জোরালো হয়ে ওঠেÑবই কি কেবল আলমারিতেই বন্দি থাকবে, নাকি আবার ফিরবে মানুষের হাতে?

আজ ৫ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২০১৮ সাল থেকে দিনটিকে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৫৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থাগারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এছাড়া ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিকে স্বরণীয় করে রাখতে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন