দেশে মানসম্পন্ন শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক, জীবনব্যাপী এবং যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় নতুন শিক্ষা আইন করতে যাচ্ছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। প্রস্তাবিত আইনে বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টার এবং নোট-গাইড বইয়ের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
এছাড়া শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য একটি ইউনিক আইডি বা স্বতন্ত্র পরিচিতি নম্বর থাকবে, বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ-এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।
এরইমধ্যে প্রস্তাবিত ‘শিক্ষা আইন, ২০২৬’ এর খসড়া প্রকাশ করেছে সরকার। এটি চূড়ান্তের আগে জনগণের মতামতের জন্য খসড়া আইন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টা পর্যন্ত নির্ধারিত opinion_edu_act@moedu.gov.bd ইমেইলে মতামত পাঠানো যাবে। জনগণের মতামতের পর তা চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
নতুন আইনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে খসড়ায় বলা হয়েছে, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার, সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষার সুযোগ অবারিত, বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক, জীবনব্যাপী ও সর্বজনীন করা এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করে আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রচলিত আইনের বিধানসমূহ অধিকতর সংহত ও কার্যকর করার উদ্দেশ্যে পরিপূরক বা সম্পূরক বিধান প্রণয়নকল্পে এই বিলা আনা হয়েছে।
এতে আরো বলা হয়েছে, যেহেতু মানসম্পন্ন শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক, জীবনব্যাপী এবং যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন; যেহেতু, শিক্ষা সম্পর্কিত প্রচলিত আইনের বিধানসমূহকে অধিকতর সমন্বিত ও কার্যকর করিবার উদ্দেশ্যে পরিপূরক বা সম্পূরক বিধান প্রয়োজন; সেহেতু, এই (শিক্ষা আইন, ২০২৬) আইন প্রণয়ন করা হলো। প্রস্তাবিত আইনকে ১১টি অধ্যায় এবং ৫৫টি ধারায় বিন্যস্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার জানিয়েছেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে আইনি কাঠামোর আওতায় এনে শিক্ষাকে নাগরিকের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যেই একটি সমন্বিত শিক্ষা আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আইন কখনোই খুব বিস্তারিত হয় না। এটি মূলত দিকনির্দেশনা দেয়। ভবিষ্যতে বিধিমালা ও নীতির মাধ্যমে একে আরো কার্যকর করা হবে।
শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, এই আইনটি দীর্ঘ আলোচনার ফল। মাঠপর্যায়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষা প্রশাসক, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন জেলার অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
খসড়া আইনের ১৫ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, সরকার কোচিং সেন্টার, সহায়ক পুস্তক (নোট বই) বা গাইড বই (যে নামেই অভিহিত হোক) প্রকাশ ও প্রাইভেট টিউশন নিয়ন্ত্রণকল্পে বিধিমালা প্রণয়ন করবে এবং ধারাবাহিকভাবে নিরুৎসাহিত করিবার মাধ্যমে এই আইন প্রবর্তনের তিন/পাঁচ বৎসরের মধ্যে কোচিং সেন্টার, স্থাপন, সহায়ক পুস্তক প্রকাশ ও প্রাইভেট টিউশন এর কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধের কার্যক্রম গ্রহণ করবে।
আইনে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক এবং ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তর নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে শিশুর মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের জন্য নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
খসড়া আইনে প্রথমবারের মতো কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষার সমান গুরুত্ব দিয়ে ডিপ্লোমা পর্যায় পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি ও মানসিক নিপীড়ন নিষিদ্ধ করা হয়েছে খসড়া আইনে। ৩৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীকে শারীরিক আঘাত বা মানসিক নির্যাতন করলে তা ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হবে এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া র্যাগিং ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
খসড়া আইনে উচ্চশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে ‘অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল’-এর ভূমিকা জোরদার এবং স্নাতক পর্যায়ে অভিন্ন গ্রেডিং পদ্ধতি চালুর কথা বলা হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউজিসি কর্তৃক নির্ধারিত অভিন্ন ন্যূনতম যোগ্যতা অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে ‘জাতীয় গবেষণা পরিষদ’ এবং ‘কেন্দ্রীয় গবেষণাগার’ স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া খসড়ায় বলা হয়েছে, সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয় বা ইজারা দিতে পারবে না, ই-লার্নিং ও দূরশিক্ষণ জনপ্রিয় করতে দেশব্যাপী একটি সাধারণ অনলাইন লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করা হবে।
খসড়ায় বলা হয়ছে, বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধান দ্বারা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা ও জীবনব্যাপী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। সরকার, আবশ্যক মনে করলে, সময় সময়, বিদ্যমান আইনের অধীন বিধি প্রণয়ন করে বা সরকারি গেজেটে পরিপত্র জারি করে, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা বয়স্ক শিক্ষা ও জীবনব্যাপী শিক্ষা কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধন করতে পারবে।
ধর্মীয়, নৈতিক শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বিষয়ে প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীর চরিত্রে মহৎ গুণাবলির সঞ্চার এবং তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, সৎসাহস ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধকরণ, সামাজিক ও ধর্মীয় চেতনা এবং নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে শিক্ষাক্রমের নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তকে সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
প্রস্তাবিত এই আইন আপাতত বলবৎ অন্য যেকোনো আইনের ওপর প্রাধান্য পাবে। যদি অন্য কোনো আইনের সঙ্গে এই আইনের বিরোধ দেখা দেয়, তবে এই আইনটিই কার্যকর হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক, বঙ্গভবনের কর্মকর্তা আটক
দেশে পৌঁছেছে তিন লাখ ২৬ হাজার প্রবাসীর পোস্টাল ব্যালট
দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির জন্য লালকার্ড দেখাতে হবে : রাশেদ প্রধান