ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) শিক্ষার্থীদের জন্য কম খরচে খাবারের অন্যতম জায়গা আবাসিক হলগুলোর ডাইনিং। তবে এসব ডাইনিংয়ে খাবার প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে কয়েকটি হলের ডাইনিংয়ে দেখা গেছে, অপরিচ্ছন্ন রান্নাঘর, মেঝেতে মাছ-মাংস কাটাকাটি, খোলা অবস্থায় রান্না করা খাবার রাখা এবং খাবার সংরক্ষণে নানা অনিয়ম রয়েছে। ফলে এসব খাবার খেয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী হলের ডাইনিংয়ে খাবার খেলেও খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে কার্যকর তদারকি নেই। ঢেকে না রাখায় রান্না করা খাবারে ধুলাবালি, মাছি ও অন্যান্য জীবাণুর সংস্পর্শে তা দূষিত হচ্ছে। বিভিন্ন সময় খাবারে পোকামাকড়সহ অনাকাঙ্ক্ষিত উপাদান পাওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েকটি হলের ডাইনিংয়ে তরকারির জন্য মাছ ও মুরগি রান্নাঘরের মেঝেতে কাটা হচ্ছে। আশপাশে ময়লা থাকায় খাবার প্রস্তুতের পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রান্নাঘরের ওয়াশরুম ব্যবহারের জন্য আলাদা জুতা বা স্যান্ডেলের ব্যবস্থা না থাকায় একই জুতা পরে ওয়াশরুমে যাতায়াত এবং খাবার প্রস্তুতের কাজ করা হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের রান্না করা তরকারিও খোলা অবস্থায় রাখা ছিল। এতে খাবারের ওপর মাছি বসতেও দেখা যায়।
শহীদ জিয়াউর রহমান হল ও লালন শাহ হলসহ মেয়েদের তিনটি হলের ডাইনিংয়েও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। এসব ডাইনিংয়ের রান্নাঘরে ওয়াশরুম ব্যবহারের জন্য আলাদা জুতা বা স্যান্ডেলের ব্যবস্থা নেই। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ওয়াশরুম ব্যবহারের পর যথাযথভাবে হাত পরিষ্কার না করেই খাবার পরিবেশন করা হয়। ডাইনিংয়ের ময়লা ও উচ্ছিষ্ট পরিষ্কারের পর একই হাতে খাবার পরিবেশনের অভিযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে সাদ্দাম হোসেন হলে আগের রাতের অবশিষ্ট ভাত ধুয়ে পরদিন দুপুরে পুনরায় রান্নার অভিযোগ রয়েছে। পরে ওই ভাতই শিক্ষার্থীদের খাবার হিসেবে পরিবেশন করা হয়। এ ঘটনায় খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের দাবি, বিভিন্ন ধরনের তরকারি রান্না করা হলেও খাবারে বৈচিত্র্য থাকে না। কোথাও কোথাও খাবারে দুর্গন্ধ, পোকামাকড় কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত উপাদান পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একাধিকবার সংশ্লিষ্টদের জানানো হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। খাবারের দাম ও মানের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে হলের বাইরে থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন।

লালন শাহ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী রাশেদ ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের। তারা খাবারের জন্য হলের ডাইনিংয়ের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পরিবেশিত খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টিমান নিশ্চিত হচ্ছে না। মাঝে মাঝে বাসি খাবার, অপদ্রব্য ও কাঁচা সবজিতে উচ্ছিষ্ট পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
খালেদা জিয়া হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, হলের ডাইনিংয়ের অবস্থা করুণ। প্রশাসনকে জানালে সাময়িকভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও কদিন পর আবার একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটে। সাদ্দাম হোসেন হলের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ডাইনিংয়ের খাবারে মাঝে মাঝে পোকামাকড় পাওয়া যায়। আগের রাতের ভাত পরদিন পরিবেশনের অভিযোগও রয়েছে। তরকারি ও ডালের মান নিয়েও শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ রয়েছে।
এ বিষয়ে লালন শাহ হলের প্রভোস্ট সহযোগী অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বিষয়টি নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। হল বডির কর্মকর্তাদেরও নিয়মিত বিষয়টি দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খাবারের মান উন্নয়ন ও সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শহীদ আনাস হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আব্দুল কাদের বলেন, রান্নাঘরের জন্য আলাদা জুতা কিনে দেওয়া হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্টরা সব সময় তা ব্যবহার করেন না। হলের সার্বিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি খোঁজ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে ডাইনিংয়ের বর্তমান ভর্তুকি পর্যাপ্ত নয়। প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে ভর্তুকি বাড়ানোর পাশাপাশি মিল রেট ৩০ টাকা থেকে ৩৫ টাকা করা গেলে তুলনামূলক ভালো মানের খাবার দেওয়া সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি ভালো মানের চাল, পর্যাপ্ত ডাল এবং আলাদা ডাল ও ভর্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যেও খাবারের মানোন্নয়নের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

