ইউজিসির ‘হিট’ প্রকল্প

পিডি নিয়োগ ফিরে পেতে আইনি লড়াইয়ে শেকৃবি অধ্যাপক

পিডি নিয়োগ ফিরে পেতে আইনি লড়াইয়ে শেকৃবি অধ্যাপক

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পে যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল হাসনাত মুহাম্মদ সোলায়মান। কিন্তু তার বিএনপি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের মৌখিক নির্দেশে মাত্র একদিনের মাথায় ওই নিয়োগ বাতিল করা হয়। পরে চুয়েটের অধ্যাপক আসাদুজ্জামানকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নিয়োগ ফিরে পেতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন অধ্যাপক সোলায়মান। এরইমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে পুনর্নিয়োগ দেওয়ার পক্ষে মতামত দেয় ইউজিসি। আর পিডি পরিবর্তনে প্রকল্পের অংশীদার বিশ্বব্যাংকের মতামত গ্রহণের কথা বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ কমিটি। তবে এসব প্রক্রিয়ায়ও নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না পেয়ে এবার আইনি লড়াইয়ে নেমেছেন ভুক্তভোগী ওই অধ্যাপক।

এরইমধ্যে গত ২৬ মে তার পক্ষে হাইকোর্টে রিট করা হয় (রিট পিটিশন নম্বর-৭৮৩৪, ২০২৫)। ওই রিট অনুযায়ী আদালত অধ্যাপক আবুল হাসনাত মুহাম্মদ সোলায়মানের নিয়োগ বাতিল কেন বেআইনি হবে না-মর্মে রুল জারি করেন। ২৩ জুনের মধ্যে রুটের জবাব দিতে ইউজিসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালত কোনো জবাব পাননি বলে রিটকারী সূত্র জানিয়েছে। ফলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্রমতে, ইউজিসি বাস্তবায়নাধীন ‘হিট’ প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার অনুদান ও বিশ্বব্যাংক ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের কাজ ২০২৩ সালের জুলাই থেকে শুরু হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। মোট ব্যয়ের মধ্যে ২ হাজার ৩৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বাংলাদেশ সরকার এবং এক হাজার ৯৮৩ কোটি ১১ লাখ টাকা বিশ্বব্যাংক বহন করবে।

জানা গেছে, হিট প্রকল্পের পিডি নিয়োগ পরীক্ষায় ৩২ প্রার্থীর মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন অধ্যাপক সোলায়মান। সে অনুযায়ী ২০২৪ সালের ১৩ মার্চ তাকে পিডি নিয়োগ দিয়ে আদেশ জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু পরের দিন অনিবার্য কারণ দেখিয়ে ওই প্রজ্ঞাপন বাতিল করে মন্ত্রণালয়। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের মৌখিক নির্দেশেই সেটি বাতিল করা হয় বলে মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্টরা জানান। পরবর্তীতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা অধ্যাপক আসাদুজ্জামানকে নিয়োগ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। তিনিই পিডি পদে বহাল আছেন।

এদিকে ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে পিডি পদে নিয়োগ ফিরে পেতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন অধ্যাপক হাসনাত। সেখানে তিনি বলেন, শুধুমাত্র আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের অনুসারী না হওয়ায় তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের মৌখিক নির্দেশে সরকারি ছুটির দিনে আমার জিও বাতিল করা হয়।

কিন্তু আইন ও নিয়ম অনুযায়ী আদেশ বাতিল করতে হলে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করতে হয়। সেটির তোয়াক্কা না করে বেআইনিভাবে তড়িঘড়ি করে ওই আদেশ রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে বাতিল করা হয়, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। তিনি বলেন, আমার একমাত্র অপরাধ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার নিয়োগ হয় ২০০৬ সালের ৩০ মে। এ ছাড়া আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাদা দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পরবর্তীতে আবার সভা করে দ্বিতীয় স্থান অধিকারীকে ফ্যাসিস্ট সরকারের অনুসারী হওয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয়।

এদিকে বঞ্চিত প্রার্থী অধ্যাপক সোলায়মানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইউজিসির মতামত চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সে অনুযায়ী গত বছরের ২৫ নভেম্বর ইউজিসি থেকে মতামত দেওয়া হয় যে, আবুল হাসনাত মুহাম্মদ সোলায়মান অন্যায্যতার শিকার হয়েছেন। এ বিষয়ে তার ন্যায্যতা নিশ্চিত করা যেতে পারে। ইউজিসির পরিচালক মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান ভূঁইয়া ওই মতামতে স্বাক্ষর করেন।

পরবর্তীতে গত ৩ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জোবায়েরের সভাপতিত্বে হিট প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বেশিরভাগ সদস্য পিডি পরিবর্তন করে অধ্যাপক সোলায়মানকে নিয়োগের বিষয়ে মত দেন। প্রকল্পটির গতি ধীর বলেও সভায় তুলে ধরা হয়।

ভুক্তভোগী অধ্যাপক আবুল হাসনাত মুহাম্মদ সোলায়মান জানান, ইউজিসির একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিশ্বব্যাংকের দোহাই দিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর বর্তমান প্রকল্প পরিচালককে বহাল রাখার চেষ্টা করছে।

এ বিষয়ে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ সম্প্রতি আমার দেশকে জানান, হিট প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউজিসি কোনো দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়াই যোগ্য ও মেধাবী হিসেবে প্রার্থী বাছাই করেছিল। প্রথমজনকে নিয়োগের পর বাতিলের যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছিল, তা ছিল দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে। এ প্রকল্প নিয়ে যাতে কেউ আঙুল তুলতে না পারে, সেভাবে আমরা কাজ করব। আমরা এটি নিয়ে কোনো ঝুঁকিতে যেতে চাই না। সরকার ও বিশ্বব্যাংক পিডি বদল করতে চাইলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।

ভুক্তভোগী অধ্যাপক সোলায়মান জানান, ইউজিসি আদালতের রুলের কোন জবাব দেয়নি। এ নিয়ে মামলা হলে লড়ার আভাস দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির একটি সূত্র।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মন্ত্রণালয় আমার পক্ষে মতামত দিল, এখন এমন কি হলো যে, আমাকে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না? ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত পিডিকে বহাল রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাব। শেষ না দেখে ছাড়ব না।

তবে হিট প্রকল্পের পিডি নিয়ে আদালতে রিটের বিষয়ে ইউজিসির অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির সচিব ড. মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন