শিক্ষাজীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির পর সনদ, ট্রান্সক্রিপ্ট ও নম্বরপত্র হাতে পাওয়ার অপেক্ষায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি যেন শেষ হচ্ছে না। অনলাইনে আবেদন ব্যবস্থা চালু হলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পেতে দীর্ঘসূত্রতা, দাপ্তরিক জটিলতা এবং বারবার ক্যাম্পাসে আসার অভিযোগ করছেন শিক্ষার্থীরা। এতে উচ্চশিক্ষা, চাকরি ও বিদেশে পড়াশোনার আবেদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে সময়মতো কাগজপত্র জমা দিতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে তাদের।
পরীক্ষানিয়ন্ত্রক দপ্তরের সেবা নিয়ে এমন অসন্তোষ অবশ্য নতুন নয়। গত এক দশকে একাধিকবার সনদ ও নম্বরপত্র সরবরাহে বিলম্বের অভিযোগ উঠেছে। ২০১৭ সালে সময়মতো ট্রান্সক্রিপ্ট না পেয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে ভাঙচুর করেন। তখন দক্ষ জনবল, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতিকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
প্রায় এক দশক পরও পরিস্থিতির পুরোপুরি পরিবর্তন না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে সেবা ব্যবস্থাপনা নিয়ে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সফটওয়্যার-সংক্রান্ত জটিলতার কথা বলা হলেও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সমস্যাটি শুধু প্রযুক্তিগত নয়; বরং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্বল সেবা ব্যবস্থাপনাই এর অন্যতম কারণ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আবেদন জমা দেওয়ার পর কাগজপত্র কোন পর্যায়ে আছে, কত দিনের মধ্যে পাওয়া যাবে কিংবা কোনো জটিলতা তৈরি হয়েছে কি না এসব জানার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। এতে করে অনলাইনে আবেদন করেও শেষ পর্যন্ত একাধিকবার দপ্তরে যোগাযোগ করতে হয়।
এছাড়া দূরবর্তী জেলার সাবেক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই ভোগান্তি আরো প্রকট হয়ে ওঠেছে। ফলে চাকরি, বিসিএস, উচ্চশিক্ষা কিংবা বিদেশে ভর্তি সব ক্ষেত্রেই সময়মতো সনদ ও ট্রান্সক্রিপ্ট না পাওয়া বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন অনলাইন আবেদন, ডিজিটাল পেমেন্ট, আবেদন ট্র্যাকিং, ই-মেইল বা এসএমএস নোটিফিকেশন এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সেবা প্রদানের ব্যবস্থা ধীরে ধীরে চালু হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের দপ্তরে উপস্থিতির প্রয়োজন কমেছে এবং সেবার স্বচ্ছতাও বেড়েছে।
বিষয়টি নিয়ে ইবি শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে এই সমস্যা সমাধানের বিভিন্ন প্রস্তাবনাও তুলে ধরেছেন। সেখানে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল অটোমেশন, অনলাইন ফি পরিশোধ, আবেদন ট্র্যাকিং, বিভাগভিত্তিক আবেদন নিষ্পত্তি, দক্ষ আইটি জনবল বৃদ্ধি এবং নিয়মিত সমাবর্তনের মাধ্যমে মূল সনদ বিতরণের মতো সুপারিশ করা হয়েছিল।
এমনকি বর্তমান শিক্ষার্থীদেরও প্রতি সেমিস্টার শেষে মার্কশিট উত্তোলনে অপেক্ষা করতে হয় দুদিন। এ বিষয়ে আল হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বর্তমানে আমরা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বসবাস করছি। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করে তাদের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমকে আরো সহজলভ্য, স্বচ্ছ ও শিক্ষার্থীবান্ধব করে তুলেছে।
তিনি বলেন, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এখনো অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে সার্টিফিকেট বা মার্কশিটের জন্য আবেদন করার পরও অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে তা হাতে পাওয়া যায় না। ফলে উচ্চশিক্ষা, চাকরি, স্কলারশিপ কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে শিক্ষার্থীদের অপ্রত্যাশিত ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়।
২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের আল ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের শিক্ষার্থী হাসেম আলী বলেন, আমরা তৃতীয় বর্ষে পড়ছি এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে জানি না কোন রসিদে কত টাকা দিতে হবে। এছাড়া একবার ব্যাংক; তারপর বিভাগে ছোটাছুটি করা লাগে। যে প্রশাসনই আসে, বলে কাজ করছে ডিজিটাল হচ্ছে কিন্তু হয় না।
তিনি বলেন, মার্কশিট এবং সার্টিফিকেট উত্তোলনের জন্য অপেক্ষা বন্ধ হোক। যারা ইতোমধ্যে সার্টিফিকেট নিয়েছে তাদের অভিজ্ঞতা এমন যে চার বছর পড়াশোনা করতে যা না কষ্ট হয়েছে, সার্টিফিকেট উঠাতে তার চেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছে।
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাছুদুল হক তালুকদার বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সনদ ও নম্বরপত্র উত্তোলনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ ও দীর্ঘসূত্রতা কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে প্রশাসন। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি বিশেষজ্ঞদের গঠিত কমিটির সহায়তায় দ্রুত পুরো ব্যবস্থাটি অনলাইনভিত্তিক অটোমেশনের আওতায় আনার কাজ চলছে। বর্তমানে নিয়ম অনুযায়ী জরুরি ফি প্রদান সাপেক্ষে পাঁচ কর্মদিবস এবং সাধারণ আবেদনের ক্ষেত্রে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে সনদ বা নম্বরপত্র দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, জরুরি প্রয়োজনে শিক্ষার্থীরা যাতে ভোগান্তিতে না পড়েন, সেজন্য শর্তপূরণ সাপেক্ষে আরো দ্রুত সনদ হস্তান্তরের চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। অটোমেশন প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীরা দূর-দূরান্ত থেকেই অনলাইনে রেজাল্ট দেখতে পারবেন। আমরা শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

