২৮ দিনের স্থগিতাদেশ শেষ হয়নি পাঁচ মাসেও

মাঈন উদ্দিন, শাবিপ্রবি

২৮ দিনের স্থগিতাদেশ শেষ হয়নি পাঁচ মাসেও

দীর্ঘ ২৮ বছরের অপেক্ষা শেষ হবে। নিজেদের অধিকার আদায়ে ভোট দিয়ে প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করবেন—এই আশায় ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ৯ হাজার শিক্ষার্থী। কিন্তু তাদের এই অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘায়িত করে হাইকোর্টে এক শিক্ষার্থীর রিট। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের মাত্র ১৯ ঘণ্টা আগে গত ১৯ জানুয়ারি বিকালে চার সপ্তাহের জন্য শাকসু নির্বাচন স্থগিত করে উচ্চ আদালত।

এই চার সপ্তাহ পেরিয়ে পাঁচ মাস অতিক্রম হয়ে গেলেও নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এদিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা ক্ষোভে ফুঁসছেন নির্বাচনের জন্য।

বিজ্ঞাপন

হাইকোর্টে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচন স্থগিত ঘোষণার পর শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ ও রেজিস্ট্রারকে রাত ১টা পর্যন্ত অবরুদ্ধ করে রাখেন। একপর্যায়ে তারা মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হয়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করেন। রাত ১টার পর উপাচার্যের আশ্বাসে প্রশাসনিক ভবনের তালা খুলে দেন শিক্ষার্থীরা। এরপর পাঁচ মাস ২৪ দিন হয়ে গেলেও শাকসু নির্বাচন আলোর মুখ দেখেনি।

গত ১২ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব ধরনের নির্বাচন আয়োজন না করার নির্দেশ দেয়। পরবর্তী সময়ে নির্বাচন আয়োজনের জন্য অনুমতি চেয়ে ইসিতে ১৪ জানুয়ারি আবেদন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইসি শাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের অনুমতি দেয়।

ইসির এই অনুমতি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী মমিনুর রশিদ শুভ ১৮ জানুয়ারি হাইকোর্টে রিট করেন। রিটে শাকসু ও হল সংসদ স্থগিত চাওয়া হয়। নির্বাচন বন্ধে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম, ব্যারিস্টার মনিরুজ্জামান আসাদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ হোসাইন লিপু, ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিক, ব্যারিস্টার বেলায়েত হোসেন ও সাদ্দাম হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনিক আর হক। ১৯ জানুয়ারি শুনানি শেষে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের এবং বিচারপতি আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ নির্বাচন চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত করে। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে ওই দিনই আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আবেদনে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চাওয়া হয়।

জাতীয়তাবাদী শিক্ষকদের নির্বাচন কমিশন থেকে পদত্যাগ

নির্বাচনের আগের দিন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ড. আশরাফ উদ্দিন ও ইউনিভার্সিটি টিচার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) শাবিপ্রবির সেক্রেটারি (বর্তমান উপাচার্য) অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলামের নেতৃত্বে সংবাদ সম্মেলন করেন জাতীয়তাবাদীপন্থি শিক্ষকরা। এ সময় শাকসু নির্বাচনের সব কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দেন তারা। ওই দিনই বিএনপিপন্থি চারজন শিক্ষক নির্বাচন কমিশন থেকে পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ছাত্রদল তিন দফা দাবিতে নির্বাচন কমিশন ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে। এই কর্মসূচির মধ্যে শাকসু নির্বাচন স্থগিতের দাবিও ছিল।

দ্রুত নির্বাচন দাবি শিক্ষার্থীদের

শাকসু নির্বাচন স্থগিতের পেছনে ‘উপর মহলের নির্দেশ’ ছিল অভিযোগ করে জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শাকসু নির্বাচনে জিএস প্রার্থী পলাশ বখতিয়ার বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল ক্যাম্পাসগুলোয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা। শাকসু সেই গণতান্ত্রিক চর্চার অন্যতম মাধ্যম। নির্বাচন স্থগিতের ২৮ দিন পরই প্রশাসনের উদ্যোগে সব প্রার্থী ও অংশীজনকে নিয়ে বৈঠকে বসা উচিত ছিল বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, দীর্ঘ আন্দোলনের মাধ্যমে শাকসু নির্বাচন আয়োজনের পর্যায়ে এসেছিল। এখন আবার নির্বাচন আদায়ের জন্য নতুন করে আন্দোলন করতে হলে সেটি অত্যন্ত হতাশাজনক হবে। প্রশাসনের উদ্যোগেই দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা করতে হবে।

বিএনপিপন্থি শিক্ষক ও ছাত্রদলের প্রত্যক্ষ মদদে শাকসু নির্বাচন স্থগিত করা হয় অভিযোগ তুলে শাবিপ্রবির ইসলামী ছাত্রশিবির সভাপতি মাসুদ রানা তুহিন বলেন, ছাত্রশিবির শাকসু নিয়ে সবার আগে দাবি দিয়েছিল, এখনো সক্রিয় থাকবে। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের প্ল্যাটফর্ম যদি চালু হয়, তাহলে বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতি, হল দখল, সিট বাণিজ্য করতে পারবে না, যার কারণে শাকসু দিতে ভয় পাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাবেই শাকসুর স্থগিতাদেশ আনা হয়েছিল অভিযোগ করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের শাবিপ্রবির সেক্রেটারি এবং শিবির সমর্থিত দুবার সাস্টিয়ান ঐক্য প্যানেলের সমাজসেবা সম্পাদক আজাদ শিকদার বলেন, যেসব কারণ দেখিয়ে রিট করা হয়েছিল, সেগুলোর কোনো যৌক্তিক ভিত্তি ছিল না। কিন্তু স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও প্রশাসন অযৌক্তিকভাবে গড়িমসি করছে এবং নির্বাচন আয়োজনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান প্রশাসন ফ্যাসিবাদী আমলের ধারায় ফিরতে চায়। তারা শিক্ষার্থীদের কণ্ঠ রুদ্ধ করে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে শাকসু নির্বাচনকে আটকে রাখতে চায় রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য।

ছাত্রদল সব সময় ছাত্র সংসদের পক্ষে ছিল উল্লেখ করে শাবিপ্রবি ছাত্রদলের সেক্রেটারি নাঈম সরকার বলেন, আমরা চাই সবার অংশগ্রহণে সুন্দর পরিবেশে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হোক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব স্টেকহোল্ডার এবং শিক্ষার্থীর মতামতের ভিত্তিতে শাকসু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

স্থগিতাদেশের অনেক দিন পার হয়ে যাওয়ায় আগের সিদ্ধান্ত ও বাস্তবতা নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাচনে অংশ নেওয়া সাধারণের ঐক্যস্বর প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মুহয়ী সারদ। চার সপ্তাহ পর পরিস্থিতি যেমন থাকবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, ২৪ সপ্তাহ পর সেটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য থাকবে কি না এমনটি ধরে নেওয়া কঠিন। তাই সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমন্বিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।

স্থগিতাদেশের পর প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও নানা অজুহাত, টালবাহানা ও কালক্ষেপণ ছাড়া আর কিছুই দেখা যায়নি উল্লেখ করে সম্মিলিত সাস্টিয়ান ঐক্য প্যানেলের ক্রীড়া সম্পাদক প্রার্থী শাকিল হাসান দ্রুত শাকসু নির্বাচনের দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘যদি কোনো কারণে নির্বাচন দিতে না চান, তাহলে তার প্রকৃত কারণ, প্রতিবন্ধকতা এবং এর পেছনের মূল পরিকল্পনা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সামনে স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করুন।’

জাতির বৃহত্তর স্বার্থে রিট

জাতির বৃহত্তর স্বার্থে রিট করেছিলেন উল্লেখ করে মোমিনুর রশিদ শুভ বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন হতে চলেছিল। নির্বাচনের আগে যেন কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে, এজন্য আমি শাকসু নিয়ে রিট করেছি। এছাড়া শাকসু ছিল একটি দলকে বিজয়ী করার জন্য পাতানো নির্বাচনের পরিকল্পনা। আদালত সবকিছু বিবেচনা করে চার সপ্তাহের জন্য শাকসু স্থগিত করে। আইনের আশ্রয় নেওয়ার কারণে আমাকে যেভাবে অপমান করা হয়েছে, বুলিং করা হয়েছে, মারার পরিকল্পনা করা হয়েছে তার জন্য তারা অনুতপ্ত হলে আমি রিট তুলে নেব।

যা বললেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার

নির্বাচনের বিষয়ে শাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. আবুল মুকিত মোহাম্মদ মুকাদ্দেস বলেন, এই সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণভাবে প্রশাসনের কাছ থেকেই আসতে হবে। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের আর কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই। নির্বাচন কমিশন থেকে যারা পদত্যাগ করেছেন, তাদের ব্যাপারেও আমরা এখনো অবহিত নই। স্থগিতাদেশ শেষ হওয়ার পর আমাদের প্রস্তুতি ছিল নির্বাচন সম্পন্ন করার। কিন্তু সে অনুযায়ী প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ আমরা দেখতে পাইনি। এছাড়া বর্তমান নির্বাচন কমিশন থাকবে কি না এবং কবে নির্বাচন হবে এসবই পুরোপুরি প্রশাসনের সিদ্ধান্ত।

তিনি আরো বলেন, আমরা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। প্রাথমিক কাজগুলো সম্পন্ন করেছি এবং নির্বাচন স্থগিতের বিষয়টি তাদের জানিয়েছি। নির্বাচনের জন্য কেনা সরঞ্জামগুলো নিরাপদে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে সংরক্ষিত আছে এবং তা বুঝে নেওয়ার জন্য প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছি। তবে এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাইনি।

যা বললেন উপাচার্য

বর্তমান উপাচার্য নিয়োগের আগে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরীর কাছে শাকসুর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি আমাদের নিয়োগ দেওয়া আইনজীবী বলতে পারবেন। আমি আইনের বিষয়ে কিছু বুঝি না। আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন সহকারী রেজিস্ট্রার কালাম চৌধুরী। তার কাছ থেকে আইনজীবীর তথ্য নিয়ে যোগাযোগ করতে পারেন।

কিন্তু গত দুই মাসে কালাম চৌধুরীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে অনেকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার অফিসে গেলে তিনি আইনজীবীর তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, রেজিস্ট্রার তাকে অফিসিয়ালি বললে তিনি তথ্য দেবেন।

শাকসু নিয়ে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘আমার নিয়োগ হয়েছে মাসখানেক হলো। এ বিষয়ে আমি তেমন কিছু জানি না। কয়েকজন শিক্ষার্থী আমার সঙ্গে বসতে চেয়েছেন। এ বিষয়ে পুরোপুরি জেনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে কথা বলে পজিটিভ সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করব।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...