ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে প্রভাষক নিয়োগে একাধিক বিতর্কিত প্রার্থী ও আওয়ামী দোসর নিয়োগের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। প্যারাসাইটোলজি, ফিশারিজ এবং ওয়াইল্ডলাইফ শাখায় একজন করে মোট তিনজন প্রভাষক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এ তিন পদে নিয়োগের জন্য গত বছরের ২৭ নভেম্বর ঢাবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগে মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সূত্র জানায়, এরই মধ্যে প্রার্থী সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটের পরবর্তী মিটিংয়ে নিয়োগ চূড়ান্ত হবে।
জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারাসাইটোলজি শাখায় জান্নাতুন নাহার ঝিনুকে নিয়োগে সুপারিশ করা হয়েছে। ঝিনুর ভাই আমিনুল হক পলাশ ছিলেন বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে তিনি নিয়োগ পান ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্সের (এনএসআই) উপপরিচালক পদে।
গোয়েন্দা বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় তাকে কলকাতা দূতাবাসে পাঠানো হয়। এনএসআইয়ের উপপরিচালক হিসেবে কলকাতা দূতাবাসে কনস্যুলার অ্যাটাচে (দ্বিতীয় সচিব) ছিলেন পলাশ। ২০২৪ সালের নভেম্বরে তিনি কলকাতা মিশন থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথি নিয়ে পালিয়ে যান।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে হাসিনা সরকারের দায়ের করা মামলায় হয়রানির নেপথ্যে ছিলেন পলাশ। বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন তিনি। সেখান থেকেই তার বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে ঝিনুর নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, ঝিনুকে নিয়োগের নেপথ্যে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষ ও নিয়োগ বোর্ডের সদস্য প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া।
জানতে চাইলে অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া আমার দেশকে বলেন, ‘অভিযোগগুলো যারা করেছে তাদের নিজেদের স্বার্থেই করেছে। যার নামের সঙ্গে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে, তিনি একাডেমিক যোগ্যতায় বাকি ৩৩ প্রার্থীর চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। যেভাবে বলা হচ্ছে তাকে আমি নিয়োগ দিচ্ছি, এটার সঙ্গে আমি বিন্দুমাত্র একমত নই।’
তিনি বলেন, ‘আমি যতদূর জেনেছি, ছাত্রলীগের সেই পলাশ তার আপন ভাই ছিল না, স্টেপ ব্রাদার ছিল। অথচ এই মেয়ে বিয়ে করেছে বিএনপি ফ্যামিলিতে। একটি হাইয়েস্ট সিজিপি পাওয়া প্রার্থীকে আমরা তার কোন আত্মীয়, কোন ভাই কোন দল করত—সে বিবেচনায় বাদ দিতে পারি না।
একজনের ব্যক্তিগত অর্জনকে আরেকজন কী করত সেটা দিয়ে ছোট করা বা তাকে ডিপ্রাইভ করাটা আমার কাছে যথাযথ মনে হয় না।’
এদিকে ওয়াইল্ডলাইফ শাখার প্রার্থী আশিকুর রহমান সমী ফলাফলে পিছিয়ে থাকলেও নিয়োগের সুপারিশে তাকে এগিয়ে রাখা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য উপদেষ্টার এপিএস হওয়ায় নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, ওয়াইল্ডলাইফ শাখায় সুপারিশপ্রাপ্ত আশিকুর রহমান সমীর অনার্স সিজিপিএ ৩ দশমিক ৬৩, যেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী আরেক প্রার্থীর সিজিপিএ ৩ দশমিক ৯১।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, নিয়োগের জন্য আগে থেকেই তিনি বিভাগীয় শিক্ষকদের সঙ্গে সখ্য তৈরি করেন। মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বিভাগের শিক্ষকদের তিনি অতিথি করেছেন এবং তাদের সঙ্গে ভ্রমণেও গেছেন। এমন একাধিক ছবি ও প্রমাণ আমার দেশ-এর হাতে এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রার্থী আমার দেশকে বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির কাছে মেধাবীরা এভাবে হেরে যাচ্ছে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে মেধার সর্বোচ্চ মূল্যায়নের কথা ছিল। অথচ অভ্যুত্থানের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সংশ্লিষ্ট একজন প্রার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগে এভাবে হস্তক্ষেপ করছেন।
ফিশারিজ শাখায় আরেক প্রার্থী আনিকা তাবাসসুম ফলাফলের দিক থেকে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও নিয়োগের জন্য মনোনীত হয়েছেন। ফলাফলের দিক থেকে আনিকা তাবাসসুমের স্থান পঞ্চম।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের অভিযোগ, ফলাফলের দিক থেকে পিছিয়ে থেকেও তদবিরের মাধ্যমে নিয়োগে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন এই প্রার্থী। এতে যোগ্যরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
প্রার্থীদের বিরুদ্ধে উল্লিখিত অভিযোগের বিষয়ে জানতে তাদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
নিয়োগ বোর্ডের সদস্য ও জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. এনামুল হক বলেন, বিষয়টি এখনো সিন্ডিকেটে অনুমোদিত হয়নি, তাই আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।
বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. আব্দুস সালাম বলেন, আমি ওই নিয়োগ বোর্ডে ছিলাম না, তাই এ বিষয়ে কিছু জানি না।
জানতে চাইলে নিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান ও উপউপাচার্য (শিক্ষা) ড. মামুন আহমেদ আমার দেশকে বলেন, কোনো প্রার্থী সম্পর্কে দেশের আইনবিরোধী কোনো অভিযোগ এলে আমরা তা অবশ্যই আমলে নিয়ে থাকি। প্রার্থী নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল কি না, তাও আমরা খোঁজ নিয়ে থাকি। এসব প্রক্রিয়া শেষ করেই বিষয়টি সিন্ডিকেটে যায়।
তিনি বলেন, বিভাগের শিক্ষক ও অনুষদের ফ্যাকাল্টি মেম্বাররা প্রার্থী সম্পর্কে আমাদের যথাযথভাবে অবহিত না করলে আমরা কীভাবে জানব ওই প্রার্থী কে ছিল, তার ব্যাকগ্রাউন্ড কী?
তিনি আরো বলেন, বোর্ডের পাঁচ সদস্যের সম্মতিতেই প্রার্থীদের সুপারিশ করা হয়েছে। যাদের সুপারিশ করা হয়েছে, তাদের মেধা, যোগ্যতা ও একাডেমিক রেকর্ডের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের সময় আমার জানার সুযোগ ছিল না যে, কেউ ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত কি না বা কেউ কারো পিএস বা এপিএস কি না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ শুরু
এক নজরে ৩০০ আসনের চূড়ান্ত প্রার্থীদের ছবি দেখুন