সাংবাদিক দেখলেই দরজা বন্ধ করে দেন কুমিল্লার ডিসি

সাংবাদিক দেখলেই দরজা বন্ধ করে দেন কুমিল্লার ডিসি
কুমিল্লা জেলা প্রশাসক রোজী আক্তার

কুমিল্লার ডিসি রোজী আক্তারের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করা, অপেক্ষায় বসিয়ে রাখা, ফোন না ধরা এবং বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য চাইলে এডিসির কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমন আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী ও সাংবাদিক নেতা।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য নিতে ডিসির কার্যালয়ে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন কয়েকজন সাংবাদিক।

মামলা নিষ্পত্তিতে এগিয়ে থাকা জেলাগুলোকে পুরস্কৃত করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। কুমিল্লায় মামলা প্রত্যাহারের সংখ্যা এবং এ বিষয়ে কতটি আবেদন হয়েছে—এ তথ্য জানতে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে ডিসির কার্যালয়ে যান আমার দেশ এর জেলা প্রতিনিধি এম হাসান।

ভিজিটিং কার্ড দেওয়ার কিছুক্ষণ পর সহকারী কমিশনার রাফিদ খান এসে জানান, ডিসি তাকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন। ডিসির সঙ্গে সরাসরি কথা বলার জন্য দ্বিতীয়বার চেষ্টা করার অনুরোধ জানানো হলেও তিনি তা কর্ণপাত করেননি।

এম হাসান জানান, গত ১৬ বছরে কুমিল্লায় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় ১ হাজার ২০০ মামলা হয়েছে। এসব মামলার প্রত্যাহার ও নিষ্পত্তির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে দেখভাল করা হচ্ছে। ডিসি ওই কমিটির সভাপতি। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে বক্তব্য নিতে গত বৃহস্পতিবার ডিসি কার্যালয়ে যান ডিবিসির কুমিল্লা প্রতিনিধি নাসির উদ্দিন। ভিজিটিং কার্ড পাঠানোর পর তাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলা হয়।

প্রায় ১০ মিনিট পর সহকারী কমিশনার রাফিদ খান জানান এ বিষয়ে অতিরিক্ত ডিসি (সার্বিক) সাইফুল ইসলামের বক্তব্য নেওয়ার জন্য।

নাসির উদ্দিন ডিসির বক্তব্য নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে জানান, বিষয়টি যেহেতু নারীসংক্রান্ত, তাই ডিসির বক্তব্য থাকলে প্রতিবেদনটি আরো সমৃদ্ধ হবে। পরে অতিরিক্ত ডিসি সাইফুল ইসলাম ডিসির কক্ষে গিয়ে ফিরে এসে দুঃখ প্রকাশ করেন। শেষ পর্যন্ত তাকে এডিসির বক্তব্য নিয়েই প্রতিবেদন করতে হয় বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে নাসির উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আজকে ডিসির আচরণটা দেখলেন।

গত ৬ আগস্ট কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের কয়েকজন নেতাকর্মী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রোজী আক্তারের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে তিনি তাদের সঙ্গে উচ্চ স্বরে ও অসহিষ্ণু আচরণ করেছেন এমন অভিযোগও উঠেছে।

এ বিষয়ে মহানগর আমির কাজী দিন মোহাম্মদ বলেন, আওয়ামী লীগের ডিসি আর বর্তমান সরকারের ডিসি একই রকম । সরকার যেভাবে বলে, উনারা এভাবেই চলেন ।‌

কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সদস্য ও এখন টিভির ব্যুরো প্রধান খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, তিনি প্রশ্ন নেবেন এবং উত্তর দেবেন, যেন কোনো রকম ভুল তথ্য বা অসমাপ্ত তথ্য গণমাধ্যমে না আসে। কিন্তু তিনি গণমাধ্যমকে ব্যস্ততা দেখিয়ে এড়িয়ে চলেন। এটা সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। কুমিল্লা বিপুল জনসংখ্যার জনগুরুত্বপূর্ণ জেলা। এখানে গণমাধ্যমের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে অতীতে প্রশাসকগণ সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তিনি সেখানে দূরত্ব বাড়াতে পারেন না।

বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং কুমিল্লার জমিনের সম্পাদক শাহাজাদা এমরান বলেন, ডিসি কারো সাথে সাক্ষাৎ করেন না এবং কারো ফোন ধরেন না—এই অভিযোগ একাধিক সাংবাদিক আমাকে করেছেন। এছাড়া সাংবাদিক ছাড়া আরো অনেকে অভিযোগ করেছেন, তিনি কারো সাক্ষাৎ দিচ্ছেন না। একজন ডিসি জেলার সর্বোচ্চ কর্মকর্তা। তার মুখের বক্তব্য আর এডিসিদের বক্তব্যের মান এক নয়।

তিনি আরো বলেন, কুমিল্লার কোনো সাংবাদিক ডিসির কাছে চাল-ডালের জন্য যান না, শুধু বক্তব্যের জন্য যান। তারা তখনই আপনার কাছে যান, যখন জনগণের কোনো দুর্ভোগ, নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কিত বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার প্রয়োজন হয়। উনি বক্তব্য এডিসিদের রেফার করতেই পারেন। তবে যেটা ওনার বিষয়, সেটা রেফার করা সমীচীন নয়। জেলা প্রশাসক যদি সাংবাদিকদের বক্তব্য না দেন, এটা শুধু দুঃখজনক নয়, দুর্ভাগ্যজনকও বটে।

কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ আহমেদ জিতু বলেন, সম্প্রতি যোগদান করা ডিসি সংবাদসংক্রান্ত বিষয়ে বক্তব্য দিতে চান না, বিষয়টি বেশ কয়েকজন বলেছেন। বিষয়টি যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কুমিল্লায় কর্মরত সাংবাদিকদের দূরত্ব বাড়বে। যা হবে খুবই দুঃখজনক বিষয়। আমি আশা করব, ডিসি মহোদয় কুমিল্লায় কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলবেন, বক্তব্য দেবেন। দায়িত্বশীল পদে থেকে তিনি সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলতে পারেন না।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও ৭১ টেলিভিশনের নিজস্ব প্রতিবেদক কাজী এনামুল হক ফারুক আমার দেশকে বলেন, উনি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন। আমাদের জানার বিষয়টা ওনার কাছ থেকেই। ওনার কাছে গণমাধ্যমকর্মীরা বক্তব্য চাইবেন। উনি যদি না দেন, তাহলে গণমাধ্যম যাবে কার কাছে?

তিনি আরো বলেন, এর আগে চ্যানেল ওয়ানের প্রতিনিধি সৌরভী ডিসির সঙ্গে কথা বলতে গেলেও তাকে বক্তব্য না দিয়ে অতিরিক্ত ডিসি সাইফুল ইসলামের কাছে পাঠানো হয়েছিল।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আবুল হাসনাত বাবুল আমার দেশকে বলেন, যে কোনো গণমাধ্যমকর্মী যখন ডিসির বক্তব্যের জন্য যাবেন, যদি উনি ওই বিষয়টা নাও জানেন, তিনি বলে দিতে পারেন—এ বিষয়ে আমি অবগত নই। অন্তত এতটুকু বললেই হয়। দেখা না করার বিষয়টি দুঃখজনক।

গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য প্রয়োজন এবং কেন তাদের এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে—এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক রোজী আক্তারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ দেওয়া হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। সাংবাদিকদের অভিযোগ, বিষয়টি শুধু কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কুমিল্লার অনেক গণমাধ্যমকর্মীই ডিসির এমন আচরণ নিয়ে ক্ষুব্ধ। তাদের দাবি, ডিসি জেলার প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রয়োজনীয় বিষয়ে নিয়ম অনুযায়ী বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেবেন।

জেডএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন