আজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক বিশেষ দিন। ক্যাম্পাস জুড়ে আনন্দ, গর্ব আর আবেগ কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হবেন এমন একজন, যিনি একসময় এই ক্যাম্পাসেই চক হাতে দাঁড়িয়েছিলেন শিক্ষক হিসেবে। তিনি আর কেউ নন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন ইউনূস। ষাট ও সত্তরের দশকে তাঁর নেওয়া ক্লাস, গবেষণা, আর শিক্ষার্থীদের প্রতি গভীর মমতা আজও অগণিত প্রাক্তন শিক্ষার্থীর স্মৃতিতে জীবন্ত।
'ইউনূস সাহেব ছিলেন অনুপ্রেরণার প্রতীক, বলছিলেন তাঁর এক সময়কার সহকর্মী, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ ড.মইনুল ইসলাম। তিনি বলেন,'আমরা যখন ক্যাম্পাসে রুটি-রুজির চিন্তায় ক্লাস করতাম, ইউনূস সাহেব তখন ভাবতেন গ্রামের নারীদের কিভাবে স্বনির্ভর করা যায়।'
এই ভাবনাই তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল নোবেল পুরস্কার জয়ী মাইক্রোক্রেডিট মডেলের দিকে। কিন্তু তারও আগে, ১৯৯৬ সালে সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, পরিবেশ ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন ইউনূস।
সাম্প্রতিক ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা আরও অনন্য। ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে জাতির আস্থা গিয়ে পড়ে তাঁর ওপর। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবির মুখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। ৮ আগস্ট ২০২৪ তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেন, নেতৃত্ব দেন এক উত্তাল সময়ের শান্তিপূর্ণ রূপান্তরে।
আজ সেই মানুষটি যখন একই ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের গলায় গাউন পরিয়ে সমাবর্তনের ভাষণ দিবেন, তখন সময় যেন ফিরে যাবে সেই পুরোনো অধ্যায়ে।
'আমার শিক্ষক, আজ আমার রাষ্ট্রনায়ক। কী গর্বের অনুভূতি! বললেন এই সমাবর্তনের এক শিক্ষার্থী, যিনি ছোটবেলায় তাঁর মায়ের কাছেই শুনেছিলেন ড.ইউনূসের ক্লাসের গল্প।
সহকর্মীর কান্নায় ফুটে উঠেছিল সম্মানের শূন্যতা
দীর্ঘ সময় শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি বড় অনুষ্ঠান হয়। দুইটি সমাবর্তন ও দুটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছিলেন অনুপস্থিত। অনুপস্থিত বললে ভুল হবে, বলা উচিত ‘অআমন্ত্রিত’। কারণ, প্রশাসনের ভাষায়, উপরে থেকে নাম আসেনি।
ক্ষমতাকে খুশি রাখতে মূল্যবোধ বিসর্জন
তৎকালীন উপাচার্যদের কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে ইউনূসের অবদানে শ্রদ্ধাশীল থাকলেও, রাজনৈতিক সমীকরণে তাঁকে ডাকার সাহস দেখাননি।
'সবাই জানত ইউনূস স্যারের নাম বলা মানেই ঢাকায় খবর চলে যাবে। কেউ চায়নি ঝামেলায় পড়তে, 'বললেন এক সাবেক সিন্ডিকেট সদস্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরেও বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভের কমতি ছিল না। অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী তাৎপর্যপূর্ণভাবে বলতেন, 'আমরা ইউনূসকে নয়, রাজনৈতিক আস্থা দেখিয়েছি।'
২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের বড় অনুষ্ঠান হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থীর সামনে দাঁড়িয়ে সহকর্মী ড. মইনুল ইসলাম, যিনি নিজেও অর্থনীতি বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক, কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তিনি বলেছিলেন, আমরা ইউনূসকে সময়মতো স্বীকার করতে পারিনি। ক্ষমতার লেজুড়বৃত্তিতে আমরা নোবেল জয়ীকেও ভুলে গেছি। একদিন এই বিশ্ববিদ্যালয় লজ্জা পাবে নিজের আচরণে।
তার কান্না থামেনি তখন, থেমে গিয়েছিল গোটা সমাবেশ। উপস্থিত শিক্ষার্থীদের অনেকেই সম্মান জানিয়েছিল সেই অনুশোচনায়।
২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের পর, যখন দেশের দায়িত্ব দেওয়া হলো মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে, তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ও যেন সুযোগ পেল পুরোনো ভুল শোধরানোর। আজকের সমাবর্তনে তিনি প্রধান অতিথি, গৌরবের, আবার অনুশোচনারও প্রতীক।
শিক্ষার্থী শিহাব হোসেন বললেন, 'যিনি একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা থেকে বাদ পড়তেন, আজ তিনিই মঞ্চের কেন্দ্রে। এটি শুধু আয়োজন নয়, এটি প্রেক্ষাপট বদলের সাক্ষ্য।'
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

