বাস্তব সমস্যা সমাধানে গবেষণায় জোর দিতে হবে: ইউজিসি চেয়ারম্যান

বাস্তব সমস্যা সমাধানে গবেষণায় জোর দিতে হবে: ইউজিসি চেয়ারম্যান

গবেষণার জন্য বয়স, দামি যন্ত্রপাতি কিংবা বড় ল্যাবরেটরি প্রয়োজন নেই। নিজের চারপাশের সমস্যা চিহ্নিত করে হাতের কাছে থাকা উপকরণ দিয়ে তা সমাধানের চেষ্টা থেকেই গবেষণার শুরু হতে পারে। তাই গবেষণাকে শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশ বা আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে সাইটেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের বাস্তব সমস্যা সমাধানে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।

বিজ্ঞাপন

শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে ‘১১তম চিন্তার চাষ ক্ষুদে গবেষক সম্মেলন ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার প্রায় ৫৮টি স্কুলের সপ্তম থেকে দশম শ্রেণির ৩১৮ জন শিক্ষার্থী এবারের সম্মেলনে অংশ নিয়েছে। তারা শিক্ষা, বিজ্ঞান, পরিবেশ, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১২৮টি গবেষণাপত্র, ধারণাপত্র ও পোস্টার উপস্থাপন করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আটটি ভেন্যুতে এসব গবেষণা উপস্থাপন করা হয়।

অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, গবেষণা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে শুরু হবে- এমন ধারণা ঠিক নয়। স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও নিজেদের চারপাশের সমস্যা নিয়ে গবেষণা করতে পারে। এবারের সম্মেলনে অংশ নেওয়া ক্ষুদে গবেষকেরা বিভিন্ন বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে নিজেদের চিন্তাশক্তি ও হাতের কাছে থাকা উপকরণ ব্যবহার করে সেগুলোর সমাধানের চেষ্টা করেছে।

গবেষণার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সাহস, উদ্দীপনা, অনুসন্ধিৎসু মনোভাব ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার ওপর গুরুত্ব দেন ইউজিসি চেয়ারম্যান। তার মতে, কোনো একটি সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি সেটির সমাধানের পথ খোঁজার সক্ষমতাই গবেষণার মূল বিষয়।

দেশের গবেষণা কার্যক্রমের প্রসঙ্গে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, গত পাঁচ দশকে সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গবেষণায় বিপুল অর্থায়ন করেছে। অনেক গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে এবং গবেষকদের সাইটেশনও হয়েছে। তবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অনেক সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘গবেষণাপত্র তৈরি হয়েছে, আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে, সাইটেশনও হয়েছে। কিন্তু মানুষের যে বাস্তব সমস্যা, অনেক ক্ষেত্রে সেই সমস্যা থেকেই গেছে।’

এ কারণে গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। দেশের সুনির্দিষ্ট সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানে গবেষণা পরিচালনার ওপর জোর দেন ইউজিসি চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, গবেষকেরা সুনির্দিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব দিলে ইউজিসি তা অর্থায়নের বিষয়টি বিবেচনা করবে। গবেষণার ফলাফল বাস্তবে কোনো সমস্যার সমাধানে কাজে লাগছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।

দেশের যানজট, বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি ও লবণাক্ততার মতো সমস্যার কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, এসব সমস্যা সমাধানে ভবিষ্যতের বিজ্ঞানীদের এগিয়ে আসতে হবে। আজকের ক্ষুদে গবেষকদের মধ্য থেকেই আগামী দিনের বিজ্ঞানী তৈরি হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ক্ষুদে গবেষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরাই আমাদের চারপাশের সমস্যার সমাধান করবে।’

স্কুল পর্যায় থেকেই গবেষণার চর্চা

স্বেচ্ছাসেবী গবেষণা সংগঠন ‘চিন্তার চাষ’ স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আগ্রহী করে তোলা এবং তাদের মধ্যে গবেষণাচর্চার পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে এ সম্মেলনের আয়োজন করে আসছে। এবার ১১তমবারের মতো আয়োজিত সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীরা নিজেদের গবেষণা ও ধারণা উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সম্মেলনের আহ্বায়ক ও ‘চিন্তার চাষ’-এর পরিচালক জাহিদুল ইসলাম। তিনি সম্মেলনের ধারাবাহিকতা ও আয়োজনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, স্কুল শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে এ ধরনের আয়োজন তাঁর কাছে আগে দৃশ্যমান হয়নি। দেশের উন্নতি ও অগ্রগতির যে স্বপ্ন দেখা হয়, ‘চিন্তার চাষ’-এর এ আয়োজনের মাধ্যমে ক্ষুদে গবেষকদের হাত ধরে তা বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. উপমা কবির বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দিচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার মধ্যেও মৌলিক গবেষণার চর্চা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। মৌলিক গবেষণার মাধ্যমেই এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।

দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের পরিকল্পনা সম্পাদক আসজাদুল কিবরিয়া বলেন, ‘চিন্তার চাষ’-এর সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। তার প্রজন্মে এ ধরনের সুযোগ পাওয়া বা দেখার সুযোগ ছিল না। বর্তমান প্রজন্ম যে সুযোগ পাচ্ছে, তার মাধ্যমে তাদের উৎকর্ষ সাধনে ‘চিন্তার চাষ’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সভাপতির বক্তব্যে ‘চিন্তার চাষ’-এর চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, স্কুল পর্যায়ে গবেষণার চর্চা ছড়িয়ে দিতে সংগঠনটির কার্যক্রম ১১ বছরের ধারাবাহিকতায় এগিয়ে চলছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে। এ প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা নিজেদের সক্ষমতা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দিচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

পরিবেশ নিয়ে গবেষণা ক্ষুদে গবেষকদের

এবারের সম্মেলনে পরিবেশবিজ্ঞান শাখায় অংশ নিয়েছে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে অবস্থিত যমুনা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। তারা ‘বাসাবাড়ির সবজির উচ্ছিষ্ট অংশ থেকে জৈব সার তৈরি এবং টব গাছের বৃদ্ধিতে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা’ শীর্ষক গবেষণাপত্র উপস্থাপন করে।

গবেষণা দলের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রভাষক মো. আবু রায়হান। তিনি বলেন, ক্ষুদে গবেষক সম্মেলনে পরিবেশবিজ্ঞান শাখায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা গবেষণার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছে। এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণামুখী চিন্তা, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বিকাশে ভূমিকা রাখবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন