ঢাবিতে হল সংসদ নেতার বিরুদ্ধে নারী হেনস্তার অভিযোগ

প্রতিনিধি, ঢাবি

ঢাবিতে হল সংসদ নেতার বিরুদ্ধে নারী হেনস্তার অভিযোগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হলে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে এক সাবেক শিক্ষার্থী দম্পতি ও তাদের সঙ্গীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং এক নারীকে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে হল সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক সাজু মিয়ার বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে একাধিক সূত্র জানায়, অভিযুক্ত সাজু মিয়া ছাত্রশিবিরের সাথী।

বিজ্ঞাপন

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিয়ম মেনে রেজিস্ট্রার খাতায় নাম লিখে হলে প্রবেশ করলেও তাদের ‘মেয়ে নিয়ে হলে আসা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলে হল ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

তবে অভিযুক্ত সাজু মিয়া অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, কাউকে হেনস্তা করা হয়নি; বরং হলের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অনুরোধ করা হয়েছিল।

ভুক্তভোগীরা জানান, গতকাল ফ্রান্স ও নরওয়ের মধ্যকার বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে তারা ছয়জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হলে যান। তাদের মধ্যে ছিলেন ২০১৬-১৭, ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী এবং একটি দম্পতি। শহীদুল্লাহ্ হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থীর আমন্ত্রণে তারা হলে প্রবেশ করেন এবং নিয়ম অনুযায়ী রেজিস্ট্রার খাতায় নামও লিখে প্রবেশ করেন।

তাদের অভিযোগ, খেলা শুরুর আগে মাঠে বসে আড্ডা দেওয়ার সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী এসে তাদের পরিচয় জানতে চান। পরিচয় দেওয়ার পরও একপর্যায়ে প্রশ্ন করা হয়, “আপনারা কোন লজিকে একটা মেয়ে নিয়ে ছেলেদের হলে খেলা দেখতে আসছেন?”

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা জানালে যে সঙ্গে থাকা নারীও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবং তিনি উপস্থিত একজনের স্ত্রী। এরপর আরও কয়েকজন এসে তাদের ঘিরে ধরেন।

অভিযোগে বলা হয়, ওই সময় নিজেকে হল সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক পরিচয় দেওয়া সাজু মিয়া এবং ক্রীড়া সম্পাদক পরিচয় দেওয়া আরেক শিক্ষার্থী তাদের জানান, হলে মেয়েদের অবস্থান করা যাবে না এবং ছবি তুলে হলের গ্রুপে পোস্ট করারও কথা বলা হয়।

ভুক্তভোগীদের দাবি, সাজু মিয়া একপর্যায়ে উচ্চস্বরে বলেন, “আপনাদের আর ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি না। আপনারা এখন উঠেন আর বের হয়ে যান, এখানে মেয়ে নিয়ে থাকা যাবে না।”

এ সময় তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অতীতেও তারা বিশ্বকাপ উপলক্ষে একই হলে খেলা দেখেছেন এবং বর্তমান আয়োজকদের ঘোষণাতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য খেলা দেখার সুযোগ রাখা হয়েছিল। কিন্তু তাদের দাবি, পরে উপস্থিত ব্যক্তিরা বক্তব্য পরিবর্তন করে বলেন, শুধু বিশেষ কিছু ম্যাচে নারী শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করতে পারবেন।

হল থেকে বের হয়ে ভুক্তভোগীরা আয়োজকদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে উপস্থিত আয়োজকরা জানান, সাজু মিয়া বা তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা খেলা দেখানোর আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।

পরে হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ঘটনাস্থলে এসে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং প্রভোস্ট বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন বলে দাবি করেন ভুক্তভোগীরা। তারা আরও জানান, ফোনে সাজু মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে কল কেটে দেন।

এদিকে তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তারা নিয়ম অনুযায়ী রেজিস্ট্রার খাতায় নাম লিখেই হলে প্রবেশ করেছিলেন। তথ্য যাচাইয়ে শহীদুল্লাহ্ হলের মূল ভবনের রেজিস্ট্রার খাতা পর্যালোচনায় তাদের নাম পাওয়া গেছে।

ঘটনার পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানজিদা আক্তার ফেসবুকে লিখেছেন, “আহা! কী সম্মানসূচক বাক্য ‘মেয়ে’ নিয়ে বের হয়ে যান। আন্দোলনের সময় মেয়েদের সামনে রাখা হয়, আর পরে অপমান ও হেনস্তা করা হয়। এই নারীবিদ্বেষী মানসিকতা কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকে থাকে?”

এদিকে অনেক শিক্ষার্থী ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, “শহীদুল্লাহ্ হলে ঢুকতে চাইলে আগে সাজু ভাইয়ের অনুমতি নিয়ে ঢুকবেন। মনে হয় হলটি তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি।”

অভিযোগের বিষয়ে সাজু মিয়া বলেন, তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অনলাইনে চরিত্রহননের চেষ্টা করা হচ্ছে।

অভিযোগের জবাবে সাজু মিয়া বলেন, “রাত ১২টার দিকে কিছু ভাই ও আপু মাঠে বসে গল্প করছিলেন। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ দিলে স্টাফ দিয়ে তাদের চলে যেতে বলি। এরপরও না যাওয়ায় আমরা গিয়ে অনুরোধ করি, কারণ হলে নিয়মিত এ ধরনের বিষয় নিয়ে ঝামেলা হয়। আমার সঙ্গে ওই আপুর একটি কথাও হয়নি, হেনস্তার প্রশ্নই আসে না।”

তিনি আরও দাবি করেন, ভুক্তভোগীদের একজন নিজেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার পরিচিত দাবি করে তাকে হুমকি দেন এবং পরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

সাজু মিয়া বলেন, “যদি ওই আপু বলতে পারেন যে আমি তার সঙ্গে একটি শব্দও বিনিময় করেছি, তাহলে আমি প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে রাজি। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে যে অনলাইন মব তৈরি করা হয়েছে, তার দায় কে নেবে?”

এদিকে ভুক্তভোগীরা জানান, তারা হল প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন এবং ঘটনার বিচার দাবি করেছেন।

অভিযুক্তের শিবির সংশ্লিষ্টতা:

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অভিযুক্ত সাজু মিয়া ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সংগঠনটির বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মহিউদ্দিন খান বলেন, “সে ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বস্থানীয় কেউ নয়। একজন অনুসারী। সে সংগঠনের সঙ্গে জড়িত কি না, তা খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইসরাফিল রতন বলেন, “শিক্ষার্থীরা পুলিশিংয়ের নামে কাউকে হেনস্তা করতে পারে না। কোনো অভিযোগ থাকলে প্রক্টর অফিস, হল প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “এ ঘটনায় এখনো পর্যন্ত প্রক্টর অফিসে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...