দেশের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান মেরিডিয়ান এগ্রো লিমিটেডের বান্দরবান জেলার লামা উপজেলাস্থ রাবার প্লট জবরদখল চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। প্লটের জায়গা জবরদখল করতে না পেরে উপজেলার সরই ইউনিয়নের ইল্লাশিয়াস্থ কোম্পানির ২৩ বছরের সৃজিত বাগান পরিচর্যায় বাধা প্রদানসহ গাছের চারা উপড়ে ক্ষতি করে যাচ্ছে দুষ্কৃতকারীরা। দুষ্কৃতকারীদের একের পর এক হানায় হুমকির মুখে দেশের বৃহৎ এই রাবারশিল্প। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে রাবার প্লটে সৃজিত বাগান রক্ষায় সরকারের সহায়তা কামনা করেন কোম্পানির ব্যাবস্থাপক আবু সাঈদ আক্তার হোসেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি নীতিমালা অনুসারে মেরিডিয়ান এগ্রো লিমিটেড উপজেলার সরই ইউনিয়নের ইল্লাশিয়াস্থ ৩০৩নং ডলুছড়ি মৌজার দাগ নং- ১০৫৫/২০, সিট নং ১৫ মূলে ২৫ একর পাহাড়ি জায়গা সরকার কর্তৃক লিজ নিয়ে গড়ে তুলেন সমন্বিত রাবার চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্প।
২০০২ সাল থেকে লিজকৃত ওই জমিতে রাবারবাগানের পাশাপাশি আম, জলপাই, ড্রাগন, লিচু, জাম্বুরাসহ বনজ গাছও সৃজন করা হয়। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে রাবার ও ফলদ বাগানে উৎপাদনও অব্যাহত রয়েছে।
প্রতি বছর এই রাবার বাগান থেকে সাদা সোনা নামে খ্যাত কাঁচা রাবার উৎপাদন করে দেশে রাবারের চাহিদা পূরণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে এই প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে উৎপাদিত রাবার থেকে আর্থিক জোগানে সরকারি রাজস্ব আয় বৃদ্ধিসহ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে এলাকায় বেকারত্ব দূরীকরণে ভূমিকা পালন করে আসছে। শুধু তাই নয়, এই প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় শতাধিক বেকারের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।
মেরিডিয়ান এগ্রো লিমিটেডর ব্যাবস্থাপক আবু সাঈদ আক্তার হোসেন অভিযোগ করে জানান, সম্প্রতি রাবার প্লটের পার্শ্ববর্তী নতুন পাড়ার লাংকম মুরুং ও তার ভাই ইয়াংইন মুরুংসহ কয়েকজন একটি কুচক্রী মহলের ইন্দনে কোম্পানির জায়গা জবরদখল করার চেষ্টায় লিপ্ত হন। তারা গত তিন মাসে বেশ কয়েকবার বাগান পরিচর্যায় বাধা প্রদান, সৃজিত রাবার চারা উপড়ে ফেলাসহ বাগান শ্রমিকদের নানা ভয়ভীতি প্রদান করে আসছেন।
এর ধারাবাহিকতায় গত ২৫ আগস্ট সকালেও কোম্পানির শ্রমিকেরা প্রতিদিনের মতো বাগান পরিচর্যা ও কিছু ফাঁকা জায়গায় চারা রোপণ করতে গেলে দুষ্কৃতকারীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে জায়গায় দা, কুড়াল, লাঠি নিয়ে বাধা দেন।
এ সময় তারা বাগানের ছয়টি রাবার চারা এবং ২০০টির মতো কাজু বাদাম গাছের চারা কেটে ফেলে। পরক্ষণে ওই জায়গায় দুষ্কৃতকারীরা কলাগাছের চারা রোপণ করে বলে জানান বাগান ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, স্থানীয় লাংকমের নেতৃত্বে একের পর এক রাবার প্লটের কাজে বাধাগ্রস্ত করছে। প্রতিবাদ করলে মারার জন্য তেড়ে আসে। তারা কোনো আইনকানুন বা সামাজিক বিচার আচার মানে না।
স্থানীয়রা জানান, মেরিডিয়ান এগ্রো লিমিটেড পর্যায়ক্রমে ২৩ বছর আগে ইল্লাশিয়ার এই বাগানটি সৃজন করেন।
সম্প্রতি নতুন পাড়ায় বসতি স্থাপনকারী কয়েকজন মুরুং এসব জায়গা তাদের বলে দাবি করে অযথা ঝামেলা করছেন। মূলত নতুন পাড়াটি পাঁচ-ছয় বছর আগে সৃষ্টি হয়। এই পাড়ার লোকজন কেউ এখানের স্থায়ী না। তারা কেউ বান্দরবানের টংকাবতী, থানচি, কেউ আবার উপজেলার আকিরাম পাড়া, গতিরাম পাড়া ও ঢেঁকিছড়া পাড়া হতে এসে এখানে বসত শুরু করে। মুরুংদের জায়গার কোনো কাগজপত্র নেই।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইয়াংইন মুরুং বলেন, ‘আমরা আদিবাসী, তাই এই জায়গা আমাদের, এটা আমাদের অধিকার।’ জায়গার কাগজপত্র না থাকলে কী হয়েছে, এই জায়গা আমরা ছাড়ব না।
এদিকে যে জায়গা মুরুংরা দাবি করছেন, সে জায়গা অনেক আগে থেকে রাবার/৮৬নং হোল্ডিং মূলে মেরিডিয়ান এগ্রো লিমিটেডের মো. নুরুল আবচার মালিক হয়ে তথায় বাগান সৃজন করে ভোগ করছেন বলে জানান মৌজা হেডম্যান দুর্যোধন ত্রিপুরা।
তিনি বলেন, কিছু দুষ্কৃতকারী মুরুং একটি কুচক্রী মহলের ইন্দনে কোম্পানির জায়গা জোর করে দখল করতে চাচ্ছেন, অযথা ঝামেলা করছেন। এ বিষয়ে উভয় পক্ষকে নিয়ে সমঝোতারও চেষ্টা করেছি। এতে কোম্পানির লোকজন এলেও মুরুংরা সমঝোতায় আসছে না। নিরপেক্ষ কথা বললে মুরুংরা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করে হয়রানি করেন।
বাংলাদেশ রাবার গার্ডেন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাউসার জামাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের পরিবেশ সুরক্ষা, বনায়ন সম্প্রসারণ ও রাবারশিল্পের উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু কিছু দুষ্কৃতকারীর হানায় আজ রাবার বাগানের মালিক ও শ্রমিকেরা আতঙ্কিত। এতে হুমকির মুখে পড়েছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে গড়া এই শিল্প।
তাই দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানাই। তিনি জানান, উপজেলার রাবার চাষ শুধু স্থানীয় অর্থনীতির জন্য নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির জন্যও একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পরিকল্পিত উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করা গেলে এই অঞ্চল দেশের রাবার চাহিদা পূরণে আরও বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
এ বিষয়ে ক্যায়াজুপাড়া পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ খন্দকার সেলিম শাহরিয়ার জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মেরিডিয়ান এগ্রো লিমিটেড ও মুরুংদের মধ্যে জায়গা নিয়ে বিদ্যমান সমস্যা আইনি মোকাবেলায় মীমাংসা করার জন্য বলেছি। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে বিরোধ মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষকে বিরোধীয় জায়গায় কোনো ধরনের কাজ না করার বলা হয়েছে।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

