খাবারের দাম কম না রাখায় দোকানিকে মারধর করেছেন ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক সদস্য কমিটির সদস্য ইয়াস্তি আল মামুন ও আলফাজ উদ্দিন মালিতা। এমন কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় ক্যাম্পাসের এক সিনিয়রকে ঠ্যাং ভাঙার হুমকি দেন তারা। শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাত ৯টার দিকে কলেজের বকুল চত্বরের পাশে কর্মচারী হোটেলে এ ঘটনা ঘটান তারা।
ঘটনার সময় উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, শুক্রবার (২৪ জুলাই) আসরের সময়ে কর্মচারী কল্যাণ হোটেলে পেয়ারা মাখা খেতে আসেন ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক সদস্য ইয়াস্তি আল মামুন। তিনি পেয়ারার দাম কত, জিজ্ঞেস করলে দোকানদার ৩০ টাকা বলেন। এরপর মামুন ২০ টাকা দেবেন বললে দুজনের মধ্যে বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। পরে দোকানদারকে নিয়ে তিনি পেয়ারা মাপার জন্য যান এবং আধা ঘণ্টা সময় আটক রাখেন। এ সময় সেই দোকানদারকে রাতে এসে মারার হুমকি দেন ছাত্রদল নেতা মামুন।
পরবর্তীতে রাত ৯টার দিকে মামুন ও ছাত্রদলের আরেক আহ্বায়ক সদস্য আলফাজ উদ্দিন মালিতার নেতৃত্বে ১০-১৫ জনের একটি গ্রুপ সেই দোকানদারকে বেধড়ক পিটুনি দেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ঢাকা কলেজের সাউথ হলের ২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী রিয়াদ তাদের বাধা দেন। পরবর্তীতে রাত ১০টার দিকে সাউথ হলের পানির পাম্পের সামনে তাকে হেনস্তা করেন অভিযুক্ত ছাত্রদলের নেতারা।
এ-সংক্রান্ত একটি অডিওতে ঢাকা কলেজ ছাত্রদল নেতা মামুন ও আলফাজ উদ্দিনকে তাদের সিনিয়র রিয়াদকে হুমকি দিতে শোনা যায়। অডিওতে মামুন রিয়াদের উদ্দেশে বলেন, ‘‘আপনি আমাদের চেনেন না, আমরা কারা? আমরা ছাত্রদলের সদস্য, আপনি জানেন না? আপনি আমাদের পক্ষ না নিয়ে কেন কর্মচারীদের পক্ষে কথা বলবেন?
আবার আলফাজ উদ্দিন রিয়াদের উদ্দেশে বলেন, ‘‘আপনার মতো সিনিয়ররা আমাদের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পায়। আপনি তো আমাকে চেনেন না। আবার রাগ দেখাচ্ছেন, আপনার ঠ্যাং যে এখনো ভালো আছে, কপাল ভালো।”
এ বিষয়ে জুনিয়র ছাত্রদলের নেতা কর্তৃক হেনস্তার শিকার হওয়া রিয়াদ প্রধান বলেন, ‘‘দোকানদার পেয়ারার দাম ৩০ টাকা চাওয়ায় ওই দোকানদারকে তারা আধা ঘণ্টা আটকে রাখে। এরপর রাতে তারা সেই দোকানদারকে ধরে মারতে থাকে। এরপর সাউথ হলের সামনে এসে তারা আমাকে বলে, ‘ভাই, আপনি কি বোঝেন না? আমাদের চেনেন না?’ সবার সামনে আপনি ডাক দিলেন কেন? জুনিয়র হয়ে তারা আমাকে বলে, ‘তোর ঠ্যাং যে এখনো ভালো আছে, কপাল ভালো।’’
অন্যদিকে, দোকানদারকে মারধরে বাধা দেওয়ায় ঢাকা কলেজের ২০২২-২৩ সেশনের আরও এক শিক্ষার্থীকে হেনস্তা করেন অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা মামুন ও আলফাজ। ওই শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ্য করে মামুনকে বলতে শোনা যায়, ‘‘তোদের জন্য ছাত্রলীগই ভালো ছিল।” পাশ থেকে আলফাজ ওই শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘‘সামনের দিনে দেখা হলে সালাম দিয়ে কথা বলবি।”
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী দোকানদার জাবেদ জানান, বিকেলে দোকানের সামনে খুচরা পেয়ারা বিক্রি করছিলাম। এ সময় আলফাজ ও মামুন এসে পেয়ারার দাম জানতে চাইলে প্রতি পিস ৩০ টাকা দাম বলি। তখন তারা প্রশ্ন তোলে, প্রতি পিস ৩০ টাকা কেন? বাইরে তো পেয়ারা ৫০-৬০ টাকা কেজি। তিনটি বড় পেয়ারার ওজন প্রায় এক কেজি। বিষয়টি যাচাই করতে তারা তাকে নিয়ে নাঈমের গলির মোড়ের দোকানে যায় এবং সেখানে পেয়ারা ওজন করলে তিনটির ওজন ৯৫০ গ্রাম হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘‘খুচরা বিক্রি করছি, তাই ৩০ টাকা না হলে ২৫ টাকা দিলেও হবে। কিন্তু এরপরও আলফাজ ও মামুন হেনস্তা করে। হলে গিয়ে দেখে নেওয়ার হুমকি দেয়।”
তিনি আরও জানান, রাত প্রায় ৯টার দিকে দক্ষিণ হলের রিয়াদ তাদের ডেকে বলেন, “তোমরা শিক্ষিত হয়ে কর্মচারীদের সঙ্গে এভাবে খারাপ ব্যবহার করছ কেন? তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করা ঠিক হয়নি।” রিয়াদ ভাইয়ের এ কথা বলার পর তারা আমাকে বিভিন্ন গালাগালি দেয়। এরপর আলফাজ, মামুনসহ আরও ৪-৫ জন তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক সদস্য ইয়াস্তি আল মামুন দ্য ঢাকা ডায়েরিকে বলেন, “ক্যাম্পাসের বাইরে কেজিতে ৬০ টাকা করে পেয়ারা পাওয়া যায়, কিন্তু ক্যাম্পাসের ভেতরে ৯০ টাকা করে বিক্রি করছিল ওই দোকানদার। যার প্রতিবাদ করায় দোকানদারের সঙ্গে একটু ঝামেলা হয়েছে। কিন্তু রিয়াদ ভাইকে হুমকি দেওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে দোকানদারের সঙ্গে ঝামেলার পর তিনি দোকানের এতজন কর্মচারীর সামনে আমাদের জেরা না করে একটু পাশে ডেকে নিয়ে বললেও পারতেন।”
আলফাজ উদ্দিন মালিতা বলেন, “দোকানে দোকানদারের সঙ্গে পেয়ারার দাম ও ওজন নিয়ে বাকবিতণ্ডা হয়। পরে পেয়ারা মাপার জন্য নাঈমের গলিতে যাই। দোকানদার তিনটি পেয়ারার ওজন ১ কেজি হবে বললেও মেপে দেখা যায়, সেখানে ৫০ বা ১০০ গ্রাম কম আছে। পরে সেখানকার এক পেয়ারার দোকানদারকে কত টাকা কেজি জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন ৬০ টাকা, অথচ ক্যাম্পাসে ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছে। পরবর্তীতে দোকানের মালিককে জিজ্ঞেস করলে তিনি ছাত্রদলের জিয়া ভাইয়ের নাম বলেন এবং বলেন, তার বাড়ি আর আমার বাড়ি চাঁদপুরে। জিয়া ভাইয়ের নাম কেন বলল, সে বিষয়ে আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, কারণ জিয়া ভাই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এরপর আমরা সবাই চলে যাই।
তিনি আরও বলেন, “রাতে সাউথ হলের রিয়াদ ভাইয়ের কাছে সে আমাদের নামে অভিযোগ করে যে, আমরা নাকি জিয়া ভাইয়ের নামে উল্টাপাল্টা কথা বলেছি। এরপর এ বিষয়টি নিয়ে একটু বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। রিয়াদ প্রধানকে হুমকি দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, কথার প্রেক্ষিতে অনেক কথা আসতে পারে। সেখানে অনেকে উপস্থিত ছিলেন। সে সময় কে কী বলেছে, তা আমি বলতে পারব না।”
এ বিষয়ে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সদস্যসচিব মিল্লাদ হোসেন বলেন, “এমন ঘটনার বিষয়টি আমরা জানি না। আসলে অন্যায় বা এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে আমরা প্রশ্রয় দিই না। আমাদের কাছে অভিযোগ এলে বা আমাদের সংগঠনের কেউ এমন কাজ করলে আমরা তার বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গেই পদক্ষেপ নিই। কেউ কোনো অপকর্ম বা অন্যায় আচরণ করলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া বা তাৎক্ষণিকভাবে সেটার সমাধান করার চেষ্টা করি। আসল ঘটনা যাচাই করে বিষয়টি আমরা আমলে নিয়ে গুরুত্বসহকারে দেখছি।”
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

