বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

অস্থিরতা তৈরির নেতৃত্বে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকেরা

মাসুদ রানা, ববি

অস্থিরতা তৈরির নেতৃত্বে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকেরা
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: সংগৃহীত

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) পদোন্নতির দাবিতে চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে গতকাল বুধবার দ্বিতীয় দফায় টানা তৃতীয় দিনের মতো শাটডাউন কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষকেরা । এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি আন্দোলনরত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করার অভিযোগও উঠেছে।

পদোন্নতি দাবির এ আন্দোলনে আওয়ামীপন্থি কয়েকজন শিক্ষক নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার রক্ষায় অনুষ্ঠিত গোপন বৈঠকেও তারা উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

ফাঁস হওয়া চব্বিশের ৪ আগস্টের একটি ভিডিওতে তৎকালীন শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. আবদুল বাতেন চৌধুরীকে বলতে শোনা যায়, ‘শিক্ষার্থীদের এক দফার কোনো যৌক্তিকতা নেই’ এবং ‘শেখ হাসিনার পক্ষে দাঁড়ানোর সময় এসেছে।’ একইভাবে মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল কাইয়ুম আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইসরাত জাহান লিজাও তার বক্তব্যে শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন জানান।

এছাড়া ২০২৩ সালের বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল খায়ের আব্দুল্লাহর (খোকন সেরনিয়াবাত) পক্ষে প্রচার কমিটিতে শিক্ষক ড. আব্দুল বাতেন চৌধুরী আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কমিটিতে সদস্য হিসেবে ছিলেন—ড. মো. আব্দুল কাইয়ুম, মোহাম্মদ তানভির কায়সার, ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন, ড. হেনা রানী বিশ্বাস, ড. ইসরাত জাহান প্রমুখ। অভিযোগ রয়েছে, এসব শিক্ষকই বর্তমানে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

গত ২১ এপ্রিল থেকে পদোন্নতির দাবিতে শাটডাউনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন শিক্ষকরা। প্রথম দফার পর মাঝে কয়েক দিন সমঝোতার মাধ্যমে বন্ধ থাকলেও ফের শাটডাউন শুরু হয় ১১ মে থেকে। কর্মসূচির কারণে দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেশনজটের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলমান শাটডাউনের কারণে বিভিন্ন বিভাগের অন্তত ৩২টি ফাইনাল পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি পরীক্ষার পুনঃনির্ধারিত তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও হতাশা তৈরি হয়েছে। ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকায় শিক্ষা কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে ল্যাব ব্যবহারেও বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে, প্রশাসনিক দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ায় প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশন জটিলতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) আয়োজিত আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল প্রতিযোগিতায় উপস্থিত থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপক্ষে পূর্বনির্ধারিত ম্যাচ খেলতে পারেনি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল দল। এ ঘটনায় খেলোয়াড়সহ সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমালোচনা করেছে।

ছাত্রসংগঠনের নেতাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করা এবং সরকারকে চাপের মুখে ফেলতেই এ ধরনের কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা সবাই স্নাতক শেষ করলেও আমরা এখনো জটে আটকে আছি। ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল, দুটি কোর্সের পরীক্ষা দিয়েছি, আরো তিনটি শিক্ষকদের আন্দোলনের কারণে স্থগিত হয়ে গেল। পরীক্ষা কবে হবে তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় আছি। শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করে এ কেমন আন্দোলন, তা আমাদের বোধগম্য নয়। আমরা দ্রুত শ্রেণিকক্ষে ফিরতে চাই।

এ বিষয়ে জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. হাফিজ আশরাফুল হক বলেন, উপাচার্য শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু শিক্ষকরা তার সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি নন। তারা তাদের সিদ্ধান্তে অনড় এবং আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে। তবে আন্দোলনে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম বলেন, তিনি শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনার জন্য বৈঠক আহ্বান করেছেন এবং তাদের বক্তব্য শুনতে চান। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখতে দপ্তরে দেওয়া তালা অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন