চলতি মৌসুমে সারা দেশে শুরু হয়েছে আমন ধানের চাষাবাদ। তবে বৃষ্টি না হওয়ায় পানি সংকটে শ্যালো মেশিনে সেচ দিয়ে ধানের চারা রোপণ করছেন কৃষক। অনেক এলাকায় পানি সংকটে আবাদি আমন ধানের জমি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। এতে আমন চাষ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন কৃষক।
চিলমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রামের চিলমারীতে দীর্ঘদিন থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় আমনক্ষেত শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে গেছ। এতে আমন ধানের বৃদ্ধি ও ফলন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। আষাঢ় শ্রাবণ মাস বর্ষাকাল হলেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ বৃষ্টি না হওয়ায়, কৃষকরা বাধ্য হয়ে শ্যালো মেশিন ও বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প দিয়ে জমিতে পানি নিয়ে আমন চারা রোপণ করেন। বৃষ্টি না হওয়ায়, ফসলের জমি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে চিলমারী উপজেলায় প্রায় ৭ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধান রোপণ করা হয়েছে। এর প্রায় ৫০ শতাংশ জমির পানি শুকিয়ে গেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায়, কৃষক চারাগাছগুলোকে রক্ষা করার জন্য আবার শ্যালো মেশিন ও বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প দিয়ে জমিতে পানি দিচ্ছে। তাতে করে ফসল উৎপাদনে বাড়ছে খরচ, খরা দীর্ঘ হলে আমনের ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
কৃষক জানান, এ এলাকায় আমন চারা রোপণের উপযুক্ত সময় আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। তবে এবারে বৃষ্টি না হওয়ায়, জমিতে পানি না থাকার ফলে শ্যালো মেশিন ও বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প দিয়ে জমি তৈরি করে আমন রোপণ করতে হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে, জমিতে আগাছা ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বাড়তে পারে। থানাহাট ইউনিয়নের গাবেরতল এলাকার আমন চাষি সোহেল রানা বলেন, বৃষ্টির অভাবে ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। চার বিঘা জমিতে আমন চারা রোপণ করি। ফসলের ক্ষেতে পানি না থাকায়, বাধ্য হয়ে শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি দিচ্ছি। রাজারভিটা এলাকার কৃষক আবুল হোসেন বলেন, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায়, আমন চাষে খরচ বেড়েছে। বৃষ্টি না হলে সেচের খরচও বাড়বে। চিলমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কনক চন্দ্র রায় বলেন, ধানের বৃদ্ধি পর্যায়ে পানির ঘাটতি হলে গাছের বৃদ্ধি কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে কুশির সংখ্যা কমে যেতে পারে এবং আগাছার পরিমাণ বাড়তে পারে। থোড় পর্যায়ে পানির ঘাটতি হলে শীষের দৈর্ঘ্য কমে যেতে পারে এবং চিটা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে ফলন কমার ঝুঁকি রয়েছে।
মাদারগঞ্জ (জামালপুর) জানান, আষাঢ় পেরিয়ে শ্রাবণ, শ্রাবণ পেরিয়ে ভাদ্র। তবু দেখা নেই কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির। বৃষ্টির অভাবে শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে ফসলের মাঠ। মাঝে-মধ্যে সামান্য বৃষ্টি হলেও শুকনো মাটি তা শুষে নিচ্ছে মুহূর্তেই। তীব্র খরায় চলতি মৌসুমে আমন চাষ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার চাষিরা। বাধ্য হয়ে শ্যালো মেশিন ও বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্র দিয়ে জমিতে পানি দিতে হচ্ছে। ফলে বৃষ্টিনির্ভর আমন ধানও এখন সেচনির্ভর হয়ে উঠছে। এতে একদিকে বাড়ছে উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে খরা দীর্ঘ হলে আমনের ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আমন ধানের চারা রোপণ শেষের দিকে। পানির অভাবে অনেক জমি শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। কোথাও শ্যালো মেশিন দিয়ে সেচ দিয়ে জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে, আবার কোথাও শ্রমিকরা সারিবদ্ধভাবে ধানের চারা রোপণ করছেন। প্রচণ্ড খরায় রোপণ করা জমিও শুকিয়ে ফেটে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও শুকিয়ে মারা যাচ্ছে ধানের চারা। এতে আমন চাষিদের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মাদারগঞ্জে ১৭ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ১৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ করা হয়েছে। বাকি জমিতে চলতি সপ্তাহের মধ্যে চারা রোপণ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চাষিরা জানান, আমনের চারা রোপণের উপযুক্ত সময় আষাঢ় থেকে ভাদ্রের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। এবার পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায়, অনেকে সময়মতো চারা রোপণ করতে পারেননি। ভাদ্রের মাঝামাঝি সময়েও অনেক কৃষক সেচ দিয়ে চারা রোপণ করছেন। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে জমিতে আগাছা, রোগ ও পোকার আক্রমণ বাড়তে পারে।
জোড়খালী ইউনিয়নের ফুলজোড় এলাকার কৃষক আহমেদ আলী বলেন, বৃষ্টির অভাবে মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। জমিতে হাল দেওয়া যাচ্ছে না। সময়মতো ধানের চারা রোপণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন গভীর নলকূপের পানি দিয়ে জমি তৈরি করে আমন রোপণ করা ছাড়া উপায় নেই।
কৃষক সুজন আহমেদ বলেন, সার-বিষ ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় এমনিতেই আমন চাষে খরচ বেড়েছে। এর মধ্যে সেচ খরচও বাড়ছে। ফলে এবার আমন চাষে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি খরচ হতে পারে।
চাষিরা আরো জানান, প্রতি বিঘা জমিতে হালচাষ, চারা রোপণ, সার-কীটনাশক, সেচ ও ধান কাটাসহ প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। বৃষ্টির ঘাটতি দীর্ঘ হলে সেচের খরচ আরো বাড়বে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, বৃষ্টিপাত কম হলেও চলতি মৌসুমে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। তিনি আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বর্ষা মৌসুমেও প্রচণ্ড রোদ ও খরা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে দ্রুতই আবহাওয়া স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


