রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলার ঘটনায় ক্যাম্পাসজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ দেখা দিয়েছে। হামলায় ১০ সাংবাদিক আহত হওয়ার পর গতকাল সোমবার গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে মানববন্ধন করেন। এ কর্মসূচি থেকে হামলায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার, ছাত্রত্ব বাতিল ও শাস্তির দাবি জানানো হয়।
একই দিন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন এবং মতিহার থানায় অজ্ঞাতনামা মামলা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে হামলার ভিডিও ফুটেজ ও জড়িতদের নামপরিচয় প্রকাশ্যে থাকার পরও মামলায় নাম উল্লেখ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিকরা। এদিকে হামলার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ না দেওয়ায় শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রভোস্টের কক্ষ থেকে সিসিটিভির হার্ডডিস্ক খুলে নেন ক্যাম্পাস সাংবাদিকরা।
গত রোববার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর এ হামলা হয়। এতে ১০ জন সাংবাদিক আহত হন। তাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা গুরুতর।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবীব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম, সহদপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলমসহ অন্তত ১০ নেতাকর্মী হামলায় অংশ নেন।
হামলার প্রতিবাদে গতকাল বেলা ১১টায় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সামনে মানববন্ধন করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। পরে তারা ক্লাস বর্জন করেন। মানববন্ধন থেকে হামলায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার, শিক্ষার্থী হলে ছাত্রত্ব বাতিল এবং পড়াশোনা শেষ করা ব্যক্তিদের সনদ বাতিলের দাবি জানানো হয়।
রাবি প্রেস ক্লাবের সভাপতি আশিকুল ইসলাম বলেন, হামলার আগে লাঠিসোটা নিয়ে অবস্থান করলেও তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। হামলার পর সিসিটিভি ও ভিডিও ফুটেজের জন্য প্রায় দেড় ঘণ্টা হলের প্রভোস্টের কাছে অবস্থান করেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে শাস্তির আওতায় না আনলে এ ধরনের হামলা আবারও হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ-আল মামুন বলেন, জুলাইয়ের পর ক্যাম্পাসে এমন ঘটনার মুখোমুখি হতে হবে, তা তারা আশা করেননি। জড়িতদের যথাযথ প্রক্রিয়ায় শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোজাম্মেল হোসেন বকুল বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের রক্তাক্ত হতে হয়েছে। গণমাধ্যম রাষ্ট্রের আয়না; সাংবাদিকদের ওপর হামলা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও উদ্বেগজনক।
তদন্ত কমিটি, মামলা
ঘটনার তদন্তে গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম-২-কে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। দ্রুত তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে কমিটিকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আব্দুল আলিম বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। থানায় হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলাও করা হয়েছে। তারা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন। একই দিন শহীদ জিয়াউর রহমান হলের উপ-রেজিস্ট্রার মনির হোসেন বাদী হয়ে মতিহার থানায় অজ্ঞাতনামা মামলা করেন। থানার ওসি গোলাম কবির বলেন, মামলা নেওয়া হয়েছে; তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার গাজিউর রহমান মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এর সঙ্গে যারা জড়িত, প্রমাণিত হলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে প্রশ্ন
হামলাকারীদের রক্ষায় সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট করার অভিযোগ উঠেছে হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, সংস্কারকাজ চলায় তখন সিসিটিভির সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল; ফলে কোনো ফুটেজ নেই। অধ্যাপক আব্দুল আলিম বলেন, তথ্য সংরক্ষিত আছে এবং ডকুমেন্টসের কোনো ঘাটতি নেই। তদন্ত কমিটি প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করবে।
শিবিরকে দোষারোপ ছাত্রদল নেতাদের
এদিকে হামলার দায় ছাত্রশিবিরের ওপর চাপিয়েছেন রাবি ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তিনি ঘটনাটিকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল বোঝাবুঝি’ উল্লেখ করে বলেন, ছাত্রদল ও সাংবাদিকদের মধ্যে দূরত্ব ও ভুল বোঝাবুঝি তৈরিতে শিবিরের অপচেষ্টার নিন্দা জানায় ছাত্রদল।
অন্যদিকে হামলায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ থাকা ছাত্রদল নেতা আহসান হাবীব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিকদের ‘গুপ্ত শিবির’ আখ্যা দিয়ে দাবি করেন, কোনো নিরপেক্ষ সাংবাদিকের ওপর হামলা করা হয়নি; ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করতে আসা সাংবাদিক নামধারী গুপ্ত শিবিরকে প্রতিহত করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের আলটিমেটাম
হামলায় জড়িতদের বিকাল ৪টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আলটিমেটাম দেন ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিকরা। তবে উপাচার্য ঢাকায় থাকায় তার ফেরার সময় পর্যন্ত অপেক্ষার অনুরোধ জানায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। উপাচার্য ফিরলে সাংবাদিকদের সঙ্গে জরুরি সভার কথা রয়েছে।
ছাত্রদল থেকে বহিষ্কার ৩, শোকজ ৬
রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় রাবি শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবিব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিব হাসান এবং বিশাল চক্রবর্তীকে পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া ছাত্রদলের আরো ছয় নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে।
গতকাল কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি বিবৃতিতে এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানানো হয়।
শোকজকৃত ছাত্রদল নেতাকর্মীরা হলেন— সহসভাপতি তাকবীর আহমেদ ইমন, শরিফুল ইসলাম, বুলবুল রহমান, ফারুক হোসেন, সহদপ্তর সম্পাদক শাহারিয়ার আলম ও কর্মী সাজু।
বিভিন্ন সংগঠন ও দলের নিন্দা, প্রতিবাদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (ডুজা) বিবৃতিতে একের পর এক হামলার বিচারহীনতার অবসান ঘটিয়ে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং দেশের সব ক্যাম্পাসে সাংবাদিকদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (চবিসাস) নেতারা বলেন, সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের মারধর, হুমকি দেওয়া বা পেশাগত কাজে বাধা দেওয়া স্বাধীন সাংবাদিকতার মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। চবিসাস অবিলম্বে হামলার ঘটনায় নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়।
এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে মানববন্ধন করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)। এতে রাকসু নেতারা এ ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত বিচার ও জড়িতদের শাস্তির দাবি করেন।
ঢাকা কলেজ সাংবাদিক সমিতি (ঢাকসাস) বিবৃতিতে অভিযুক্তদের দ্রুত শনাক্ত করে উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে হামলার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়।
রাবিতে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের (আরইউজে) নেতারা। তারা বলেন, এ ধরনের হামলা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মুক্ত গণমাধ্যম ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য গুরুতর উদ্বেগের সৃষ্টি করে। তারা হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার ও তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
জামায়াতে ইসলামী রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ এবং তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। বিবৃতিতে তারা জানায়, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকরা হামলার শিকার হওয়া খুবই উদ্বেগের এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ঘটনায় অপরাধী যেই হোক তাকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
রাবির ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এক বিজ্ঞপ্তিতে দলটি জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি মুক্তবুদ্ধি ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
জাতীয় ছাত্রশক্তি রাবি, ঢাবিসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ধারাবাহিক হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টস (বিএজে) নেতারা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এ ঘটনাকে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন। তারা বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের ওপর এমন নগ্ন আক্রমণ বন্ধে সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
এছাড়াও নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (খুবিসাস), চুয়েট সাংবাদিক সমিতি (চুয়েটজা), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাব (জবি প্রেস ক্লাব), ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ইবিসাস), ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাব (ইবি প্রেস ক্লাব), কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাব (কুবি প্রেস ক্লাব), বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাব (বেরোবি প্রেস ক্লাব), বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিসহ (ববিসাস) বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা]
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

