অতিথির বর্ণনায় উঠে এলো ইরানের বিয়ে বাড়িতে মার্কিন হামলার ভয়াবহতা

অতিথির বর্ণনায় উঠে এলো ইরানের বিয়ে বাড়িতে মার্কিন হামলার ভয়াবহতা

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের কুহেস্তাক উপকূলীয় গ্রামে বিয়ের অনুষ্ঠানে ভয়াবহ মার্কিন হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ৬০ জনের বেশি। নিহতদের মধ্যে চার বছরের এক শিশুও রয়েছে। ঘটনাটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর অন্যতম বড় বেসামরিক হতাহতের ঘটনা হিসেবে সামনে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার রাতে কুহেস্তাক গ্রামে মরিয়ম মাল্লাহির বিয়েকে কেন্দ্র করে প্রায় ৩৫০ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। স্ট্রেইট অব হরমুজের কাছে অবস্থিত গ্রামটির দুটি বাড়িতে চলছিল বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। অতিথিরা ছিলেন উৎসবের আমেজে। এর মধ্যেই হঠাৎ বিস্ফোরণে মুহূর্তেই বদলে যায় পুরো দৃশ্য।

বিস্ফোরণে বাড়ির ছাদ ও দেয়াল ধসে পড়ে। ইরানি রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে চারজন নিহত হন। গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন আরো একজন দুই দিন পর মারা যান। এতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচজনে। আহত হয়েছেন অন্তত ৬০ জন; অন্য এক হিসাবে আহতের সংখ্যা ৬৭ বলা হয়েছে।

‘নারীদের আনন্দ-উল্লাস চলছিল, তারপরই বিকট বিস্ফোরণ’

বিয়ের অতিথি জেইনাব মাল্লাহি বলেন, বিস্ফোরণের ঠিক আগমুহূর্তেও নারীদের আনন্দ-উল্লাস চলছিল। ড্রপসাইট নিউজকে তিনি বলেন, আমি এখনো সেই নারীদের আনন্দ-উল্লাসের শব্দ শুনতে পাই। হঠাৎ বসার ঘরের ছাদ ও দেয়াল আমাদের ওপর ভেঙে পড়ে। সেই শব্দ রাত থেকে দিন, দিন থেকে রাত—সবসময় আমাকে তাড়া করে বেড়ায়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি বিস্ফোরক বাড়ির ছাদ ভেদ করে মেঝেতে প্রায় দেড় মিটার গভীর গর্ত তৈরি করে। আরেকটি আঘাতে একটি খেজুরগাছ ভেঙে পড়ে দেয়ালের ওপর। বিস্ফোরণের পর অতিথিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সবাই চিৎকার করতে করতে বিভিন্ন দিকে ছুটতে থাকেন। উদ্ধারকর্মীরা পরে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের সন্ধান শুরু করেন। তখনও ঘটনাস্থলে বিয়ের অনুষ্ঠানের আলো জ্বলছিল।

‘এটি পুরোপুরি আবাসিক এলাকা’

কনের বাবা ও স্থানীয় জেলে আলী মাল্লাহি জানান, বিয়েতে প্রায় ৩৫০ জন মানুষ উপস্থিত ছিলেন। তার দাবি, বাড়ি দুটি সম্পূর্ণ আবাসিক এলাকায় অবস্থিত এবং আশপাশে কোনো সামরিক স্থাপনা ছিল না। বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, সম্ভবত গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়েছে। কিন্তু অন্য বাড়িতে পৌঁছে চারদিকে মানুষকে ছোটাছুটি করতে দেখে তিনি বুঝতে পারেন, পরিস্থিতি অনেক ভয়াবহ।

হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন চারজন—চার বছর বয়সী আমির আলী কারিমি, ১৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ মাল্লাহি, ৪৩ বছর বয়সী ‍কুলসুম মাল্লাহি নেজাদনিয়া এবং ৫০ বছর বয়সী জারখাতুন তাহেরি। গুরুতর আহত ২২ বছর বয়সী আসিয়েহ মোলাইনেজাদ পরে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

হামলার দায় নিয়ে তদন্ত করছে যুক্তরাষ্ট্র

ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের হামলা কি না, তা আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বেসামরিক হতাহতের এই ঘটনা নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত করছে বলে জানিয়েছে সংবাদ মাধ্যম এক্সিওস।

সেন্টকম-এর মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন সম্পর্কে তারা অবগত এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কখনো বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানায় না।

হোয়াইট হাউসে বৃহস্পতিবারের এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও বলেন, এ ঘটনা সম্পর্কে তার কাছে নতুন কোনো তথ্য নেই। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সময় বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় না এবং ঘটনাটি তদন্ত করা হবে।

তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, বিয়ের অনুষ্ঠানে আঘাত হানা বিস্ফোরকটি অন্য কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত লেগে ছিটকে আসার সম্ভাবনার চেয়ে সরাসরি মার্কিন অস্ত্রের আঘাত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলায় হামলার সুনির্দিষ্ট উৎস ও লক্ষ্য সম্পর্কে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। তবে আনন্দঘন একটি বিয়ের অনুষ্ঠান মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর শোক ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা, এনডিটিভি

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন