পরমাণু শক্তি কমিশনের সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ

পরমাণু শক্তি কমিশনের সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বাপশক) প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে আধুনিক সাংগঠনিক কাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ ও গবেষণা অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

‘বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক সক্ষমতা সমৃদ্ধকরণ: বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি বিজ্ঞানী সংঘ (বায়েসা) এ সভার আয়োজন করে।

রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুর ২টায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বাপশক) প্রধান কার্যালয়ের ড. আনোয়ার হোসেন অডিটরিয়ামে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম. মঈনুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সাভারের মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের সভাপতি ড. এ. এস. এম. সাইফুল্লাহ। আলোচনায় বিশেষজ্ঞ হিসেবে অংশ নেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও পারমাণবিক চুল্লি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী আলী জুলকারনাইন, সাবেক চেয়ারম্যান ডা. মো. সানোয়ার হোসেন, সাবেক পরিচালক (জীববিজ্ঞান বিভাগ) ডা. ফারিয়া নাসরিন এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সদস্য (পরিকল্পনা) মো. হাসিনুর রহমান।

সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. এ. এস. এম. সাইফুল্লাহ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর উন্নয়নে পরমাণু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সক্ষমতা। কৃষি, চিকিৎসা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্প ও পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ দেশের টেকসই উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের ৩১ দফার ৩০ নম্বর দফায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের গবেষণা কার্যক্রমের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক সক্ষমতা সমৃদ্ধ করার অঙ্গীকার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বাপশককে আরও শক্তিশালী, আধুনিক, দক্ষ ও ভবিষ্যৎমুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা প্রয়োজন।

মূল প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন দেশের পরমাণু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা, উদ্ভাবন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও বিশেষায়িত প্রযুক্তিগত সেবার একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। কৃষি, খাদ্য ও স্বাস্থ্য, শিল্প, পানি সম্পদ, পরিবেশ, খনিজ সম্পদ, নিউক্লিয়ার মেডিসিন ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

তিনি বলেন, সাভারের পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা রিঅ্যাক্টর, সাইক্লোট্রন, ট্যান্ডেম অ্যাক্সিলারেটর, গামা ইরেডিয়েটর, লিন্যাক, টিস্যু ব্যাংক, আইসোটোপ হাইড্রোলজি, সেমিকন্ডাক্টর ও উন্নত গবেষণাগারগুলো দেশের গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো। স্বাস্থ্য খাতে নিউক্লিয়ার মেডিসিন, ক্যান্সার চিকিৎসা, রোগ নির্ণয় ও রেডিওআইসোটোপ উৎপাদনেও বাপশক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় উন্নত ও জলবায়ু-সহনশীল ফসল উদ্ভাবন, খাদ্য সংরক্ষণ এবং বিকিরণ প্রযুক্তির প্রয়োগেও কমিশনের অবদান রয়েছে।

সাংগঠনিক কাঠামো আধুনিকায়নের তাগিদ

ড. সাইফুল্লাহ বলেন, বাপশকের বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো ১৯৮৫ সালের হওয়ায় বর্তমান বহুমাত্রিক কার্যক্রম ও জনবলের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নেই। দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও বিশেষায়িত দক্ষতা প্রয়োজন হলেও বিজ্ঞানীদের জন্য আধুনিক ‘সায়েন্টিফিক ক্যারিয়ার ট্র্যাক’, যথাযথ পদোন্নতি ও পেশাগত স্বীকৃতির ঘাটতি রয়েছে।

এ ছাড়া পদ ও গ্রেড অবনমন, গ্রেড বৈষম্য এবং জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মেধাবী জনবল ধরে রাখা ও নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। ফলে বাপশকের সাংগঠনিক কাঠামো, জনবল ও ক্যারিয়ার ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জাতীয় পারমাণবিক কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর সঙ্গে বাংলাদেশের পারমাণবিক কর্মসূচি নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করবে। এ প্রেক্ষাপটে বাপশকের ‘ওনার্স ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যাপাবিলিটি’, স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন ও কৌশলগত কারিগরি তদারকি সক্ষমতা শক্তিশালী করা জরুরি।

ভবিষ্যৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর), জ্বালানি চক্র ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বাপশককে জাতীয় কারিগরি সহায়তা সংস্থা (টেকনিক্যাল সাপোর্ট অর্গানাইজেশন—টিএসও) হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক কর্মসূচি ও প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা নিশ্চিত করতে বাপশকের যুগোপযোগী সাংগঠনিক কাঠামো, আধুনিক সায়েন্টিফিক ক্যারিয়ার ট্র্যাক ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন জরুরি। একই সঙ্গে গবেষণা অবকাঠামোর টেকসই আধুনিকায়ন, জাতীয় মানবসম্পদ ও নিউক্লিয়ার ইনোভেশন রোডম্যাপ প্রণয়ন, পারমাণবিক নিরাপত্তা ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণ প্রয়োজন।

ড. সাইফুল্লাহ বলেন, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাপশককে একটি আধুনিক, দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জাতীয় পারমাণবিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব।

বিজ্ঞানীদের কাজে লাগানোর আহ্বান

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, জনকল্যাণে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে কমিশনের বিজ্ঞানীদের নিবেদিতপ্রাণভাবে কাজ করতে হবে। গবেষণার নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর আহ্বান জানান। এসব ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।

সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে সরকার কাজ করছে। পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনে এসএমআর প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।

দেশের মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়নে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানে দেশের বিপুলসংখ্যক মেধাবী বিজ্ঞানী কাজ করছেন। দেশের উন্নয়নে এই মেধাবীদের যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। এ লক্ষ্যে কমিশনের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান এবং এর সক্ষমতা বাড়াতে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন