সম্পদ হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬ সংসদে দ্রুত পাস করায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তার কথা বলে শরিয়াহ ফরজ বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই বলে, উল্লেখ করেন তিনি। মামুনুল হক, আইনটির ১২২এ ও ১২২বি ধারা পুনর্বিবেচনা করে আলেম-উলামা, মুফতি, ফকীহ ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন।
সোমবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, আইনটি রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সংসদে পাস হয়েছে। জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে সম্পত্তি হস্তান্তরের নতুন বিধানটি শরিয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
মামুনুল হক বলেন, বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে সেই নিরাপত্তার নামে এমন কোনো বিধান করা উচিত নয়, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত হেবা, ওয়াসিয়ত ও ফারায়েজের বিধান পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়। তার ভাষায়, জীবিত অবস্থায় হেবা এবং মৃত্যুর পর ফারায়েজ অনুযায়ী উত্তরাধিকার—দুটি সম্পূর্ণ পৃথক বিষয়। নতুন আইন কোনো ওয়ারিশকে তার শরিয়াহ নির্ধারিত অধিকার থেকে বঞ্চিত করার হাতিয়ার হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ইসলামে হেবা কেবল কাগজে-কলমে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার বিষয় নয়; এর একটি নির্দিষ্ট শরয়ী কাঠামো রয়েছে। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী ইজাব, কবুল ও কবয হেবার মৌলিক বিষয়। বিশেষ করে গ্রহীতার বাস্তব দখল ও কর্তৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ। অথচ নতুন আইনে মালিকানা হস্তান্তরের পাশাপাশি দাতার জীবদ্দশা পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগ ও ব্যবহার তাঁর কাছেই রাখার সুযোগ রয়েছে। এতে প্রকৃত হস্তান্তর ও কবয কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মামুনুল হক হেবা বণ্টনে সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচারের বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনার কথাও তুলে ধরেন। তিনি সহিহ বুখারিতে বর্ণিত নু‘মান ইবনে বশীর (রা.)-এর হাদিসের উল্লেখ করে বলেন, তার পিতা তাকে বিশেষ একটি দান করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) জানতে চান, অন্য সন্তানদেরও অনুরূপ দেওয়া হয়েছে কি না। নেতিবাচক উত্তর পেয়ে তিনি বলেন, আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো। পরে তার পিতা ওই দান ফিরিয়ে নেন।
এ ছাড়া হেবা সম্পন্ন হওয়ার পর তা ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কঠোর সতর্কতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ বুখারির আরেকটি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে মামুনুল হক বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার হেবা ফিরিয়ে নেয়, সে ওই কুকুরের মতো, যে নিজের বমি পুনরায় খায়।’
তিনি বলেন, হেবা ইসলামী শরিয়াহর একটি স্বতন্ত্র বিধান। এর মালিকানা, কবয, দখল ও প্রত্যাহার সম্পর্কে শরিয়াহতে সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। তার অভিযোগ, নতুন আইনটিতে ইসলামের হেবা ও ফারায়েজের বিধানের প্রতি অবজ্ঞার দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে।
আইনটির পক্ষে আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে মামুনুল হক বলেন, এতে ইসলামী বিধান সম্পর্কে তার অজ্ঞতা কিংবা অবজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছে। হেবা, ওয়াসিয়ত ও ফারায়েজের মৌলিক পার্থক্য যথাযথভাবে অনুধাবন না করে মুসলিম পারিবারিক আইনসংক্রান্ত বিধান প্রণয়ন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের পক্ষ থেকে নতুন বিধান সাধারণ হেবা বা মুসলিম আইনের হেবাকে প্রভাবিত করবে না বলা হলেও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মামুনুল হক। তিনি বলেন, বাস্তবে এই আইন হেবার শরয়ী কাঠামো পাশ কাটিয়ে সম্পত্তির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের নতুন ব্যবস্থা তৈরি করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় সম্পত্তির ভোগ ও নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে রেখে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে তা হস্তান্তর করলে প্রকৃত কবয, পূর্ণ মালিকানা ও হস্তান্তরের চূড়ান্ততা নিয়ে শরয়ী প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
মামুনুল হক আরো বলেন, হেবার মাধ্যমে যেন আল্লাহ নির্ধারিত ফারায়েজকে পাশ কাটিয়ে কোনো নির্দিষ্ট ওয়ারিশকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পথ তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। জীবদ্দশায় কোনো ব্যক্তি এমনভাবে নির্দিষ্ট উত্তরাধিকারীর নামে সম্পত্তি হস্তান্তর করলে, যাতে তাঁর মৃত্যুর পর অন্য ওয়ারিশরা কার্যত বঞ্চিত হন, তাহলে তা ইসলামের উত্তরাধিকার ব্যবস্থার ন্যায়বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংসদে বিলটি পাসের আগে শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার দাবি ওঠার পরও এটি দ্রুত পাস করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে জনমনে প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। হেবা, ওয়াসিয়ত ও ফারায়েজের মতো গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী বিধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়নের আগে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, মুফতি, ফকীহ ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া উচিত ছিল।
বিএনপির বিভিন্ন রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রসঙ্গ তুলে মামুনুল হক বলেন, দলটি ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সমুন্নত রাখা এবং মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামবিরোধী কোনো আইন না করার অঙ্গীকারও করা হয়েছে। তাহলে ইসলামের হেবা ও ফারায়েজের মতো সুস্পষ্ট শরিয়াহ বিধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইন এত দ্রুত পাস করা হলো কেন, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
মামুনুল হক ‘সম্পদ হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এর ১২২এ ও ১২২বি ধারা পুনর্বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হলেও এর নামে হেবার শরয়ী বিধান ও আল্লাহ নির্ধারিত ফারায়েজকে দুর্বল করা যাবে না।
মানুষের তৈরি কোনো আইনকে আল্লাহর নির্ধারিত বিধানের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ ধর্মপ্রাণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এমএমআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন




