জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

অর্থছাড় জটিলতায় আটকে আছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ গ্রন্থাগার নির্মাণ

অর্থছাড় জটিলতায় আটকে আছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ গ্রন্থাগার নির্মাণ

দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। এই ক্যাম্পাসেই ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত হচ্ছে বিশ্বমানের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। ধারণক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে এটি হতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ এবং এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অত্যাধুনিক লাইব্রেরি ভবন।

তবে বারবার নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকা ও অর্থ ছাড়ের জটিলতায় আটকে আছে শিক্ষার্থীর বহুল প্রত্যাশিত এই গ্রন্থাগারের কাজ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে উদ্বোধনের কথা থাকলেও এখনো শেষ হয়নি নির্মাণকাজ। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরোদমে অর্থ ছাড় পেলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে। আর বর্তমান গতিতে চলতে থাকলে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর নাগাদ উদ্বোধন করা যেতে পারে গ্রন্থাগারটি।

বিজ্ঞাপন

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকেও নতুন এই গ্রন্থাগার ভবনটি হতে যাচ্ছে ব্যতিক্রমী। রোমান সাম্রাজ্যের বিখ্যাত স্থাপত্য ‘কলোসিয়াম’-এর বৃত্তাকার নকশা ও স্তম্ভের ছন্দের প্রতিফলন থাকছে ভবনটির নকশায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১০১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রায় আড়াই লাখ বর্গফুট আয়তনের ছয়তলা এই ভবনে একই সময়ে পাঁচ থেকে সাত হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যতে অন্তত ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর চাহিদার কথা বিবেচনায় রেখে গ্রন্থাগারটির পরিকল্পনা করা হয়েছে।

১৯৮৫ সালে চালু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারটিতে মাত্র ৪৪৭টি আসন রয়েছে। ১৪ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর তুলনায় এটি অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে প্রতিদিনই গ্রন্থাগারে পড়তে এসে ফিরে যেতে হয় অনেক শিক্ষার্থীকে।

অন্যদিকে নতুন গ্রন্থাগারের নির্মাণকাজে দীর্ঘসূত্রতায় কাঙ্ক্ষিত আধুনিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে নতুন গ্রন্থাগার চালু করা হলে দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তির অবসান হবে।

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী রবিন মিয়া বলেন, বর্তমানে যে লাইব্রেরিটি আছে, সেখানে আমাদের সুযোগ-সুবিধা পর্যাপ্ত নয়। একই সঙ্গে আসন সংখ্যাও সীমিত। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছি, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রন্থাগারের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা হোক।

নতুন গ্রন্থাগারে দেশি-বিদেশি পাঠ্যবই, রেফারেন্স বই, গবেষণা জার্নাল, ক্যারিয়ার উন্নয়ন এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিবিষয়ক প্রায় তিন লাখ ভলিউম বইয়ের সংগ্রহ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

ডিজিটাল জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে এতে থাকবে ই-লাইব্রেরি ও বৈশ্বিক সংযোগের সুবিধা। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক লাইব্রেরি নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রকাশকের ডেটাবেসে প্রবেশাধিকার পাওয়া যাবে। পাশাপাশি দুষ্প্রাপ্য বইয়ের ডিজিটাল সংস্করণও সহজে পড়ার সুযোগ থাকবে। গবেষণার কাজে সহায়তার জন্য অ্যান্ডনোট ও জোটেরোর মতো আধুনিক রেফারেন্স ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার ব্যবহারের সুবিধাও থাকবে।

এছাড়া অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ সুবিধার অংশ হিসেবে থাকবে ইলেকট্রনিক ওয়ার্কস্টেশন, অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং স্টুডিও, অডিও-ভিজ্যুয়াল কিয়স্ক, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR) স্টুডিও এবং জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (GIS) অধ্যয়ন ও গবেষণার জন্য ভূ-স্থানিক লাইব্রেরি।

ছয়তলা আধুনিক এই ভবনের প্রতিটি তলা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী সাজানো হচ্ছে। নিচতলায় থাকবে কেন্দ্রীয় সার্ভিস বিভাগ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস। দ্বিতীয় তলায় থাকবে পাঠ্যবই, ম্যাগাজিন, পত্রিকা ও রেফারেন্স সেকশন। শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বইয়ের কর্নার ও স্বতন্ত্র বিভাগের পাশাপাশি হালকা খাবার গ্রহণের সুবিধাসহ একটি ‘ওপেন রিডিং স্পেস’ও থাকবে। তৃতীয় তলা গবেষকদের জন্য বিশেষভাবে সাজানো হবে। এখানে থাকবে গবেষণা পরামর্শ কক্ষ, বিশেষায়িত পাঠকক্ষ, সাহিত্য বিভাগ, ভিডিও রেফারেন্স সেকশন এবং ভূ-স্থানিক লাইব্রেরি। চতুর্থ তলায় সংরক্ষণ করা হবে বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের ইতিহাস, গবেষণাপত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক দলিলের আর্কাইভ ও অফিস রেকর্ড।

পাঠকদের স্বাচ্ছন্দ্য ও সৃজনশীলতা ধরে রাখতে পুরো ভবনে থাকবে আধুনিক ক্যাফে, লাউঞ্জ, প্রায় ৩০টি বিশ্রামকক্ষ, আর্ট গ্যালারি, এক্সিবিশন হল, কনফারেন্স রুম, সেমিনার হল ও গ্রুপ ডিসকাশন রুম।

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন না ঘটিয়ে রাত থেকে ভোর পর্যন্ত প্রাথমিক কিছু কাজ চালানোর মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। তবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের অভিযোগ, নির্মাণকাজ চলছে ধীরগতিতে।

জানা যায়, গ্রন্থাগারটির নির্মাণকাজ শেষ করার সম্ভাব্য সময়সীমা ছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর। তবে কয়েক দফা সময়সীমা পিছিয়ে গেছে। বর্তমানে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরকে কাজ শেষের সম্ভাব্য সময়সীমা হিসেবে ধরা হয়েছে।

প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) অনুমোদনে দেরি হওয়ায় কাজ পিছিয়ে গেছে। এখন দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে বলে আশা করছেন তিনি।

প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন জানান, ভবনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করে ভবনটি হস্তান্তর করা সম্ভব হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প তদারকি কমিটির প্রধান উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শামছুল আলম বলেন, প্রকল্পের অর্থ আটকে থাকায় কাজের গতি কমে গিয়েছিল। এখন অর্থ এসেছে। দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের তাগাদা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন