ধরুন সময়টা আজ থেকে এক হাজার ২০০ বছর আগের। আপনি হাঁটছেন কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের পাদদেশে। চারপাশে ঘন সবুজ শালবন, বাতাসে ভেসে আসছে পাখির ডাক আর ভিক্ষুদের মৃদু প্রার্থনার ধ্বনি। দূরে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল ইটের তৈরি এক বৌদ্ধবিহার, যেখানে শত শত ভিক্ষু একসঙ্গে বসবাস করছেন, ধ্যান করছেন, শাস্ত্র পাঠ করছেন। এ ছিল বাংলার পাল যুগের সময়, যখন জ্ঞানচর্চা, ধর্মীয় সাধনা ও স্থাপত্যকলায় এ অঞ্চল ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
সে সময়ের বহু স্থাপত্য নিদর্শন আজও ছড়িয়ে আছে কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতি পাহাড় এলাকায়। মহাস্থানগড়, পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার কিংবা ময়নামতির বিহারগুলো সেই প্রাচীন সভ্যতার সাক্ষ্য বহন করে। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া প্রতিটি ইট, প্রতিটি পোড়ামাটির ফলক যেন আমাদের ফিরিয়ে নেয় হাজার বছরের অতীতে।
ময়নামতির বিহারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হলো শালবন বিহার। ১৯৫৫ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. নলিনী কান্ত ভট্টশালীর পরামর্শে এখানে প্রথম বৈজ্ঞানিক খননকাজ শুরু হয়। তৎকালীন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব পাকিস্তানের উদ্যোগে পরিচালিত সেই খননকাজে একে একে উন্মোচিত হতে থাকে প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার অসাধারণ নিদর্শন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নতুন করে খনন কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং শালবন বিহারের প্রকৃত গুরুত্ব আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ঐতিহাসিকদের মতে, অষ্টম শতকে পাল সম্রাট ধর্মপাল বা দেবপালের আমলে নির্মিত হয় শালবন বিহার। প্রায় ১৬৭ মিটার দীর্ঘ বর্গাকার প্রাচীরের ভেতরে ছিল ১১৫টি ভিক্ষু কক্ষ আর মাঝখানে একটি বিশাল স্তূপ। ভিক্ষুরা এসব কক্ষে বসবাস করতেন, ধ্যান করতেন এবং সমবেত হয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতেন। প্রতিটি কক্ষের দরজা খোলা থাকত ভেতরের আঙিনার দিকে, যেন জ্ঞান ও প্রার্থনার আলো একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করা যায়।
খননকাজে এখানে পাওয়া গেছে অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক, ব্রোঞ্জের বুদ্ধমূর্তি, রুপার মুদ্রা, অলংকার এবং গৃহস্থালি সামগ্রী। কিছু ফলকে বুদ্ধের জীবনকথা, কিছুতে পৌরাণিক কাহিনি, আবার কোথাও দেখা যায় ফুল-লতা-পাতার নকশা। এসব নিদর্শন শুধু শিল্পকলার নিদর্শনই নয়, বরং সে সময়ের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনেরও সাক্ষ্য দেয়।
মজার বিষয় হলো, শালবন বিহার নামটি এসেছে এর চারপাশে এক সময় বিস্তৃত শালবনের কারণে। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া একটি সিলমোহরে লেখা ছিল ‘শ্রী ভদ্রদেব মহাবিহার আর্য মহাসংঘস্য’। গবেষকদের ধারণা, এই বিহারের প্রকৃত নাম ছিল ভদ্রদেব মহাবিহার, যা কোনো এক শাসক বা দাতার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
শালবন বিহার ছাড়াও ময়নামতি অঞ্চলে রয়েছে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল। কোটবাড়ি এলাকায় অবস্থিত আনন্দ বিহার এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বিহারগুলোর একটি। সপ্তম বা অষ্টম শতকে নির্মিত এই বিহারের কেন্দ্রীয় মন্দির ও চারপাশের ভিক্ষুক্ষের কাঠামো আজও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এছাড়া ভোজা বিহার, রুপবানমুড়া, ইটাখোলামুড়া এবং কুটিলামুড়া—প্রতিটি স্থাপনাই প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দিনের মতে, ময়নামতি অঞ্চলে প্রায় ৫০টিরও বেশি বিহারের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তবে সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে হাতেগোনা কয়েকটির। বাকি অনেক বিহার এখনো অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে। তার মতে, এসব প্রত্নস্থলকে সংরক্ষণ করে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরতে পারলে ভবিষ্যতে আরো অনেক নিদর্শন বিশ্বঐতিহ্যের মর্যাদা পেতে পারে।
ইতিহাসবিদ আহসানুল কবীরের মতে, প্রাচীন সমতট অঞ্চলের রাজধানী ছিল পাত্রীকারা, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই লালমাই পাহাড়। তার মতে, লালমাইয়ের পুরো এলাকায় এখনো বহু বিহার মাটির নিচে লুকিয়ে আছে। অতীতে যুদ্ধ কিংবা রাস্তা নির্মাণের সময় অনেক নিদর্শন নষ্ট হয়ে গেছে।
এই ঐতিহাসিক পরিবেশের মাঝেই গড়ে উঠেছে আধুনিক বিদ্যাপীঠ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৬ সালের ২৮ মে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়টি আজ দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র। বর্তমানে ছয়টি অনুষদের অধীনে ১৯টি বিভাগে শিক্ষাদান কার্যক্রম চলছে এখানে।
শালবন বিহারের পাশেই অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয় যেন ইতিহাস ও আধুনিকতার এক অনন্য মিলনস্থল। একদিকে হাজার বছরের পুরোনো বৌদ্ধ সভ্যতার নিদর্শন, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের জ্ঞানচর্চা—এ দুইয়ের মিলনে তৈরি হয়েছে এক বিশেষ পরিবেশ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন ক্যাম্পাসের আশপাশের পথে হাঁটেন, তখন চোখে পড়ে শালবনের পোড়া ইটের দেয়াল। দূরে লালমাই পাহাড়ের সবুজ ঢাল আর পাখির ডাক তাদের মনকে এক অন্যরকম প্রশান্তি এনে দেয়। এই পরিবেশ শুধু পড়াশোনাকেই প্রাণবন্ত করে না, বরং শিক্ষার্থীদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত করে।
শালবন বিহার এক সময় ছিল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র—যেখানে দর্শন, সাহিত্য, চিকিৎসা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতো নানা বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হতো। তাই অনেকেই একে মধ্যযুগীয় বিশ্ববিদ্যালয় বলেও উল্লেখ করেন। আজ সেই ঐতিহাসিক স্থাপনার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, যেন অতীতের জ্ঞানধারা বর্তমানের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলেছে।
হাজার বছরের পুরোনো এই প্রত্নস্থল আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাংলা শুধু কৃষিভিত্তিক সমাজই ছিল না; বরং জ্ঞান, সংস্কৃতি ও শিল্পকলার এক সমৃদ্ধ ভূখণ্ডও ছিল। তাই শালবন বিহারকে কেবল ইটের ধ্বংসাবশেষ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আমাদের ইতিহাস, পরিচয় ও ভবিষ্যতের প্রেরণা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


চাঁদাবাজিতে একাকার বিএনপি, আ.লীগ ও জামায়াত নেতাকর্মীরা