যুক্তরাষ্ট্রের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়েই শেষ হলো ইরান যুদ্ধ

Musa Monir
মুসা মনির

যুক্তরাষ্ট্রের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়েই শেষ হলো ইরান যুদ্ধ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মার্চ মাসে ঘোষণা করেছিলেন যে ইরান যুদ্ধ শেষ করতে হলে দেশটির ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ প্রয়োজন। তবে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের একধরনের শর্ত সাপেক্ষ আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়েই এ যুদ্ধ শেষ হলো। ইরানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক প্রাথমিক চুক্তিকে কেন্দ্র করে কট্টরপন্থি রিপাবলিকান ও যুদ্ধবাজ নেতারা এখন তীব্র সমালোচনা করছেন।

রক্ষণশীল বিশ্লেষক এরিক এরিকসন লিখেছেন, ‘ট্রাম্প ইরানের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন।’

বিজ্ঞাপন

টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ সতর্ক করে বলেছেন, ‘যেসব ধর্মীয় উন্মাদ আমাদের হত্যা করতে চায়, তাদের হাতে শত শত কোটি ডলার তুলে দেওয়া কোনো ভালো সিদ্ধান্ত নয়।’

লুইজিয়ানার সিনেটর বিল ক্যাসিডি ক্ষোভ প্রকাশ করে একে ‘কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতিগত ভুল’ বলে অভিহিত করেছেন।

সমালোচকদের মতে, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় ধাক্কা। কারণ এর মাধ্যমে ইরান তাৎক্ষণিকভাবে অবরুদ্ধ থাকা শত শত কোটি ডলার ফেরত পাচ্ছে এবং পরবর্তীতে দেশ পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিলও পাবে।

এ ছাড়া চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিন পর ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে ফি বা শুল্ক আদায়ের আংশিক সুযোগ পেতে যাচ্ছে।

তবে এই সমালোচকরা মূল বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছেন। ট্রাম্পের আসল ভুল যুদ্ধ শেষ করা নয়, বরং এই অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে জড়ানো। বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে আসার সিদ্ধান্তটিই সঠিক ছিল। কারণ যুদ্ধ চালিয়ে গেলে আরো অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটত। এই যুদ্ধ ইতোমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতি এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জয়ের সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছিল।

ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, ‘আমরা যদি এই চুক্তি না করতাম, তবে আরো কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক বছর বোমা ফেলা যেত, কিন্তু হরমুজ প্রণালি কখনোই উন্মুক্ত হতো না। আমি কোনো অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখতে চাইনি।’

অপ্রিয় সত্য হলো, ইরান এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছে এবং সে কারণেই তারা আলোচনায় আধিপত্য বিস্তার করেছে। ট্রাম্প চুক্তি করতে যতটা সম্ভব দেরি করেছিলেন, কারণ তিনি জানতেন যেকোনো চুক্তিই তার জন্য অপমানজনক হবে। কিন্তু যুদ্ধে ব্যর্থতার কারণে তার সামনে আর কোনো ভালো পথ খোলা ছিল না। এই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত যে অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে হবে এবং বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে কূটনীতির ওপর জোর দিতে হবে।

২০১৫ সালে বারাক ওবামার আমলে ইরান পারমাণবিক সমস্যার একটি সমাধান হয়েছিল। তখন ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রায় পুরোটাই দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিল এবং কঠোর পরিদর্শনের অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন যুদ্ধবাজরা সেটির বিরোধিতা করেছিলেন।

ট্রাম্প ২০১৮ সালে ওবামা আমলের চুক্তিটিকে অত্যন্ত খারাপ বলে বাতিল করেন এবং দাবি করেছিলেন যে তিনি হলে আরো ভালো চুক্তি করতে পারতেন। কিন্তু আট বছর পর ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরুর হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়। তিনি হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাব বিবেচনা না করেই বোমা হামলা শুরু করেছিলেন।

নতুন এই চুক্তিটি ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার মূল প্রশ্নগুলোকে পরবর্তী আলোচনার ওপর ছেড়ে দিয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই যুদ্ধের ফলে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে আরো বেশি আগ্রহী হবে।

ধারণা করা হচ্ছে, ৬০ দিনের আলোচনার মেয়াদ আরো বাড়বে এবং ইরান এই আলোচনাকে দীর্ঘায়িত করবে। আমেরিকার মানুষের মধ্যেও নতুন করে কোনো ইরান যুদ্ধের আগ্রহ থাকবে না। এর ফলে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) উত্তর কোরিয়ার কৌশল অবলম্বন করে পারমাণবিক অস্ত্রাগার গড়ে তুলতে পারে।

এই যুদ্ধের ফলে আমেরিকা অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল হয়েছে এবং ১৩ জন মার্কিন সেনাসহ হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। যুদ্ধ অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ লিন্ডা বিলমেসের মতে, ঘাঁটির মেরামত, গোলাবারুদ প্রতিস্থাপন এবং আহত সেনাদের দীর্ঘমেয়াদি ভাতাসহ এই যুদ্ধের চূড়ান্ত খরচ প্রায় ১ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। আমেরিকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা মানবিক সহায়তায় ব্যয় হতে পারত এমন বিপুল অর্থ পারস্য উপসাগরে অপচয় করা হয়েছে।

এই যুদ্ধের মাধ্যমে সাধারণ ইরানিদের সবচেয়ে বেশি প্রতারিত করা হয়েছে। গত জানুয়ারিতে ইরানি সরকারের দমনপীড়নের পর ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘সহায়তা আসছে।’ কিন্তু এখন ইরানিদের আরো বেশি অত্যাচারী সরকারের অধীনে রেখে আসা হয়েছে। এমনকি এই মাসে ট্রাম্প প্রশাসন এক ইরানি নারীকে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে ফেরত পাঠিয়েছে, যেখানে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টই নিজ নাগরিকদের যেতে নিষেধ করে। সুতরাং, এই ব্যর্থ ইরান যুদ্ধ চুক্তির সমালোচনা অবশ্যই করা উচিত, তবে ট্রাম্পের যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসাটা ট্র্যাজেডি নয়, বরং যুদ্ধটাই ছিল আসল ট্র্যাজেডি।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...