ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনের খাবারের দোকান, হাকিম চত্বর, টিএসসিসহ হলগুলোর ফাস্টফুডের দোকানগুলোর খাবার পরিবেশনের পর সেগুলো অযত্নে ফেলে রাখা হচ্ছে। এতে প্রায় সময়ই কুকুর-বিড়াল এসব প্লেটে মুখ দিচ্ছে। দোকানদারদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও শিক্ষার্থীদের উদাসীনতায় এমনটা ঘটছে বলে জানিয়েছেন সচেতন শিক্ষার্থীরা। এর ফলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক দুর্বলতা, জলাতঙ্ক ও মৃত্যুর আশঙ্কাসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এসব অব্যবস্থাপনা বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজর দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
গত কয়েক দিন ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থান ঘুরে ফাস্টফুড ও অন্য খাবারের দোকানগুলোর প্লেটে কুকুরের মুখ দেওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। খাবার শেষে নির্ধারিত ঝুড়ি ও উঁচু স্থানে প্লেট না রাখা, দ্রুত প্লেটগুলো সংগ্রহ না করা, প্লেটগুলো অ্যান্টিসেপটিক ও গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার না করাসহ বিভিন্ন কারণে কুকুরের লালা ও জীবাণু প্লেটে থেকে যায়।
এ সমস্যার সমাধানে খাওয়া শেষে প্লেটগুলো নির্ধারিত ঝুড়িতে রাখা, অ্যান্টিসেপটিক দিয়ে অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট প্লেটগুলো ধোয়া, দোকানি ও শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো, প্লেটের পরিবর্তে ‘ওয়ান টাইম’ প্লেট ব্যবহার করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কুকুরের লালায় থাকা বিষাক্ত ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ‘অ্যানিমেল ফ্লু’, ‘রেবিস ভাইরাস’, ‘ক্যাপনোসাইটোফাগা ক্যানিমোরসেস ব্যাকটেরিয়া’সহ নানা জীবাণু এসব প্লেটের মাধ্যমে শিক্ষার্থীসহ খাবার গ্রহণকারী সবার দেহে প্রবেশ করছে। ক্যাপনোসাইটোফাগা ক্যানিমোরসেস ব্যাকটেরিয়াটি মানবদেহে প্রবেশের তিন থেকে পাঁচদিনের মধ্যে জ্বর, মাংসপেশিতে ব্যথা, বমি, শারীরিক দুর্বলতা এবং অনেক ক্ষেত্রে ডায়রিয়া দেখা দেয়। অনেকাংশ ক্ষেত্রেই এই ব্যাকটেরিয়া রক্তকে দূষিত করে ফলে মৃত্যুও ঘটতে পারে আক্রান্ত ব্যক্তির।
এই বিষয়ে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ডা. আরিফুল বাসার বলেন, কুকুরের রেবিস ভাইরাস থাকে তবে জলাতঙ্কের আশঙ্কা থাকবে। এই জলাতঙ্কের মৃত্যুর হার শতভাগ। তবে রেবিস ভাইরাস না থাকলে ‘এনিমেল ফ্লু’ থেকে সর্দি, কাশি বা পশমের অ্যালার্জি হতে পারে। এ জন্য কুকুর কোথাও মুখ দিলে সেটিকে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মতো সাবান পানিতে ধুতে হয়। এতে জীবাণু চলে যায়। না হলে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা থাকে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ডিটারজেন্ট পাউডার দিয়ে ধুয়ে বালতিতে রাখা পানিতে দুই-একবার চুবিয়ে খাবার পরিবেশনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতিনিয়ত গরম পানি দিয়ে ধোয়ার কথা থাকলেও তা ব্যবহার করা হয় সপ্তাহে সর্বোচ্চ একদিন বা দুদিন। তবে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় দোকানের ম্যানেজারের দাবিÑ কুকুরে কোনো প্লেটে মুখ দিলে সেটি আর ব্যবহার করা হয় না।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের চত্বরের ফাস্টফুডের দোকান কফি হাটের ম্যানেজার মামুন রিয়াজ বলেন, ‘যেসব প্লেটে কুকুর মুখ দেয় সেগুলোকে চিহ্নিত করা গেলে তাৎক্ষণিক ভেঙে ফেলা হয়। বর্তমানে আমরা তুলনামূলক উঁচু স্থানে প্লেট রাখার ঝুড়ি দিয়েছি। খাবার দেওয়ার সময়ে প্লেটগুলো ঝুড়িতে রাখার জন্য আমরা বলে দেই। তবুও অনেকে রাখেন না।’
এদিকে দোকানগুলোর কর্মচারীদের পাশপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও খাবার প্লেটের যত্নের বিষয়ে উদাসীনতা দেখা গেছে। শিক্ষার্থী বা বহিরাগতদের খাবারের পরে প্লেট নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে বললে দোকানি বা কর্মচারীদের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করেন তারা। জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনের ফাস্টফুড দোকানের ম্যানেজার মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘কুকুর যাতে প্লেটে মুখ না দেয় সে জন্য বছরখানেক আগে আমরা ঝুড়ি ও স্ট্যান্ডের ব্যবস্থা করি। আমার দোকানে শুধু প্লেট সংগ্রহ করে এমন পাঁচজন ছেলে আছে।’
মফিজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘অনেক সময় একটুর জন্য কুকুর মুখ দিয়ে দেয়, তখন সেই প্লেটকে ভেঙে ফেলি। অনেক শিক্ষার্থীকে ঝুড়িতে প্লেট রাখতে বললে আমাদের রাগ দেখায়।’
মফিজুলের দোকানের কর্মচারী ইব্রাহিম বলেন, ‘আমরা নিচে থাকা প্লেটগুলো তাড়াতাড়ি তুলে ফেলি। কুকুরে মুখ দিলে নগদে ভেঙে ফেলি। গত একমাসে ২৫টির বেশি প্লেট ভাঙা হয়েছে।’
নিজেদের সচেতনতা ও সতর্কতা বাড়ানোর কথা বলছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘বিন ইকুইপমেন্টের চেয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রতি উদাসীন মানসিকতাই এ ক্ষেত্রে দায়ী। শিক্ষার্থীরা নিজে খেয়ে প্লেট রেখে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে। কিন্তু, সবার এটা ভাবা উচিতÑ পরেরবার এই প্লেটেই নিজে বা অন্য কেউ খাবে।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা দোকানগুলোতে ‘ওয়ান টাইম’ প্লেট ব্যবহারের পরামর্শ দেব। না হলে হঠাৎ করেই তো শিক্ষার্থীদের আচরণে কোনো পরিবর্তন আসবে না।’
বিশ্ববিদ্যায়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের জন্য এটা চরম অস্বাস্থ্যকর। যদি দোকানগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি ছাড়া থাকে, তবে সেগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। আর অনুমতি থাকলে সেগুলোকে তদারকির আওতায় আনা হবে।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

