রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) মার্কেটিং বিভাগে র্যাগিংয়ের অভিযোগে ভিডিও ধারণ করাকে কেন্দ্র করে তিন সাংবাদিক ও রাকসুর দুই নেতার ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র ভবনের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও বিভাগের সভাপতির উপস্থিতিতেই হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
মারধরের শিকার হয়েছেন রাবি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও ডেইলি ক্যাম্পাস প্রতিনিধি মারুফ হোসেন মিশন, ঢাকা পোস্টের প্রতিনিধি জুবায়ের জিসান, দৈনিক মানবকণ্ঠের প্রতিনিধি আবু বকর অনিক, রাকসুর এজিএস সালমান সাব্বির এবং রাকসুর বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর।
অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন মার্কেটিং বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান হিমেল, ওমি, আহমেদ রিয়াদ, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের সামি, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের সামির এবং ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের মাহমুদুল হাসান জিহাদ ও আতিকসহ আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মার্কেটিং বিভাগের কয়েকজন জুনিয়র শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন যে, সিনিয়র শিক্ষার্থীরা ‘মিট-আপ’-এর নামে তাদের দীর্ঘ সময় সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রেখে র্যাগিং করছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে সাংবাদিকরা বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে অবহিত করেন। পরে এক সহকারী প্রক্টরকে সঙ্গে নিয়ে তারা ঘটনাস্থলে যান।
সেখানে গিয়ে দেখা যায়, রবীন্দ্র ভবনের পাশের সাইকেল গ্যারেজ এলাকায় কয়েকজন জুনিয়র শিক্ষার্থীকে পাঁচটি সারিতে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। এ সময় সাংবাদিকরা ভিডিও ধারণ করলে উপস্থিত সিনিয়র শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং র্যাগিংয়ের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তারা দাবি করেন, এটি কোনো র্যাগিং নয়, বরং ওরিয়েন্টেশন ও খেলাধুলা সংক্রান্ত আলোচনা চলছিল।
তবে ভিডিও ধারণের পর সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা ভিডিও মুছে ফেলার জন্য বারবার চাপ দেন। সাংবাদিকরা এতে রাজি না হলে তাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে আরও কয়েকজন সাংবাদিক ঘটনাস্থলে গেলে তাদেরও আটকে রাখা হয় এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়া হয়।
পরে ঘটনাস্থলে রাকসুর এজিএস সালমান সাব্বির ও বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ।
প্রায় দেড় ঘণ্টা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান, মার্কেটিং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. এম বোরাক আলী এবং শিক্ষক ড. নুরুজ্জামান। তারা উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি প্রক্টর অফিসে নিয়ে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু প্রক্টর অফিসে যাওয়ার জন্য সবাই ঘটনাস্থল ত্যাগ করার সময় নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিক আবু বকর অনিককে লক্ষ্য করে “আমাদের স্যারের সামনে হাঁটছিস?” বলে হাবিবুর রহমান হিমেল প্রথমে থাপ্পড় ও লাথি মারেন। এরপর আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি দিতে থাকেন। একই সময় অন্য সাংবাদিকদেরও মারধর করা হয়। রাকসুর দুই নেতাকেও গালিগালাজ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান নিজ গাড়িতে করে কয়েকজনকে নিরাপদে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যান।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক মারুফ হোসেন মিশন বলেন, “র্যাগিংয়ের অভিযোগ পেয়ে আমি প্রক্টরকে জানাই এবং পরে ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে জুনিয়রদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। ভিডিও ধারণ করায় আমাকে বারবার ভিডিও ডিলিট করতে চাপ দেওয়া হয়। আমি রাজি না হওয়ায় গালিগালাজ, হুমকি এবং পরে মারধরের শিকার হই। আমার সঙ্গে আরও দুই সাংবাদিক এবং রাকসুর দুই নেতাকেও মারধর করা হয়েছে। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।”
অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান হিমেল বলেন, “এটা ভুল তথ্য। সেখানে শুধু কথা-কাটাকাটি হয়েছে। কোনো মারামারির ঘটনা ঘটেনি।”
তবে একই বিভাগের শিক্ষার্থী মাহির বলেন, “মারধরের ঘটনা ঘটেছে। তবে আমি এতে জড়িত ছিলাম না।”
রাকসুর বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর বলেন, “পরিস্থিতি শান্ত করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু উল্টো আমিও হামলার শিকার হয়েছি। আমরা প্রশাসনের কাছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।”
মার্কেটিং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. এম বোরাক আলী বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিস্তারিত জানতে সরাসরি বিভাগে এসে কথা বলতে হবে।”
সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক জহুরুল ইসলাম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউকে মারধরের অধিকার কারও নেই। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ও আইনবিরোধী কাজ। জড়িতদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, “আমি নিজে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম। সাংবাদিকদের সঙ্গে যা ঘটেছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। আমরা বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেছি। কিন্তু এরপরও হামলার ঘটনা ঘটেছে। আমার সামনেই সাংবাদিক ও রাকসু নেতাদের মারধর করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত জঘন্য কাজ। যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।”
র্যাগিংয়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ঘটনাস্থলে শিক্ষার্থীদের যেভাবে পাওয়া গেছে, তাতে র্যাগিংয়ের সব ধরনের লক্ষণ ছিল। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

