এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে ব্যাপক পতনের সঙ্গে শূন্য পাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড। প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সরাসরি শোকজ করা হচ্ছে। তাদের জবাবের ভিত্তিতে পরবর্তী শাস্তির সুপারিশ করা হবে বলে জানা গেছে।
গত সোমবার প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, এবার মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে সর্বোচ্চসংখ্যক ২২৬টিসহ সাধারণ ৯টি বোর্ডে ৫৭টি এবং কারিগরিতে ২৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থী পাস করেনি। গতবারের চেয়ে এবার শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৭৮টি বেড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে জানান শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন।
তবে প্রতি বছরই শূন্য পাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে একইভাবে শোকজ করা হলেও তা থেকে মুক্ত হতে পারছে না শিক্ষা বোর্ডগুলো। কারণ, প্রতি বছর নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান এ তালিকায় যুক্ত হওয়ায় চূড়ান্ত শাস্তি থেকে তারা রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে, এবার শূন্য পাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর খুব কমসংখ্যক পরীক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও তাদের অকৃতকার্য হওয়া নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ, বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মকর্তাসহ পর্যাপ্ত জনবল থাকলেও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১ থেকে ১০ জনের নিচে। তবে এবার সিলেট ও কুমিল্লা বোর্ডে কোনো শূন্য পাস বিদ্যালয় নেই বলে জানা গেছে।
মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান গতকাল মঙ্গলবার আমার দেশকে জানান, শূন্য পাস মাদরাসাগুলোকে ইতোমধ্যে শোকজ নোটিস করা হয়েছে। পাঁচ দিনে ভাগ করে এসব প্রতিষ্ঠানকে বোর্ডে ডাকা হবে। কোনো পরীক্ষার্থী পাস না করার বিষয়ে সরাসরি তাদের জবাব বা ব্যাখ্যা শুনে পরবর্তী সুপারিশ করা হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা মাদরাসা অধিদপ্তরে। কারণ, মাদরাসা বোর্ডের কোনো ধরনের শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার নেই।
শূন্য পাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে এলাকাবাসীর মাধ্যমেও বেশ চাপের মুখে পড়ছে জানিয়ে এই শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান আরো বলেন, আগে কেউ না পড়ে পাসের সুযোগ পেলেও এখন আর পাবে না। এবারের এই পরিস্থিতি দেখে অনেকেই শিক্ষা নেবে বলে আশা করেন তিনি। ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষক-জনবল থাকলেও অল্পসংখ্যক পরীক্ষার্থীকে পাসের যোগ্য করতে না পারায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে সমালোচনা করেন তিনি।
শূন্য পাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ প্রসঙ্গে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে শোকজ করা হবে। কে কী জবাব দেয়, তা শুনে তার ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি ও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি জানান, শূন্য পাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দ্বিতীয়বার যাতে একই ফল না করে সেজন্য সতর্ক করা হয়। এভাবে তৃতীয়বার কেউ একই ফল করলে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। তবে সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠান দ্বিতীয়বার শূন্য পাস না করায় চূড়ান্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।
মাদরাসা বোর্ডের শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান ও পরীক্ষার্থী
মাদরাসা বোর্ডের অধীন গাজীপুরের কাপাসিয়ার ইকুরিয়া সিরাজিয়া গার্লস দাখিল মাদরাসার ছয় পরীক্ষার্থীর মধ্যে কেউ পাস করেনি। একই ভাবে কাপাসিয়ার পাচুয়া দারুস সুন্নাহ দাখিল মাদরাসার ছয়, একই এলাকার মিরুয়া আলিম মাদরাসার ১৮, নরসিংদীর সুটুরিয়া ফজলুল হক খান দাখিল মাদরাসার ১৫, মাদারীপুরের কালকিনির করোকির চর আকিমুন্নেসা দাখিল মাদরাসার ৮, কালকিনির করকির চর হামিদিয়া দাখিল মাদরাসার একজন, উত্তর রমজানপুর জিন্নাতিয়া দাখিল মাদরাসার ১০, ময়মনসিংহের মাজার আলী আকন্দ দাখিল মাদরাসার ১১, গফরগাঁওয়ের বড় দাখিল মাদরাসার ৭, গৌরীপুরের লক্ষ্মীপুর নাসিরুদ্দিন দাখিল মাদরাসার দুই পরীক্ষার্থীর কেউ পাস করেনি।
একই ভাবে শূন্য পাস মাদরাসাগুলোর মধ্যে ময়মনসিংহের ছয়টি, জামালপুর, নাটোর ও টাঙ্গাইলের একটি করে, রাজশাহীর চারটি, নওগাঁর পাঁচটিসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
ময়মনসিংহ বোর্ড
ময়মনসিংহ বোর্ডে শূন্য পাস চার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলোÑজামালপুরের সরিষাবাড়ীর মনিজা আবুল গার্লস হাই স্কুল (পরীক্ষার্থী ১১ জন), মুক্তাগাছা কলেজ (চার), শহীদ স্মৃতি গার্লস হাইস্কুল (পাঁচ) ও কদমতলী কারিপাড়া হাই স্কুল (তিনজন)।
ঢাকা বোর্ড
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ছয় প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেনি। সেগুলো হলোÑটাঙ্গাইলের সালিমাবাদ আনোয়ার খান মডেল হাই স্কুল (পরীক্ষার্থী আটজন) ও গোবিন্দপুর হাই স্কুল (১০ জন), রাজবাড়ীর বনগ্রাম আতারুন্নেসা গার্লস হাই স্কুল (১১ জন) এবং জলদিয়া হাই স্কুল (সাতজন), কিশোরগঞ্জের জঙ্গলিয়া ইউনিয়ন গার্লস হাই স্কুল (পাঁচজন) এবং বিদেশ কেন্দ্রের এথেন্সের বাংলাদেশ দোয়েল একাডেমি (একজন)।
চট্টগ্রাম বোর্ড
চট্টগ্রাম বোর্ডের আট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেনি। সেগুলো হলোÑনারায়ণহাট গার্লস হাই স্কুল (তিনজন), আন্দারমানিক জুনিয়র হাই স্কুল (১০ জন), মহালছড়ি হাই স্কুল (১৫ জন), উড়িরচর জুনিয়র হাই স্কুল (১০ জন), জারুলছড়ি হাই স্কুল (১৯ জন), তারাবানিয়া হাই স্কুল (পাঁচজন) এবং অন্য দুটি স্কুলের পরীক্ষার্থী সংখ্যা পাঁচ ও ১৭ জন।
যশোর বোর্ড
যশোর বোর্ডে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছেÑসাতক্ষীরা নৈশ স্কুল (সাতজন), মণিরামপুরের হেলেঞ্জি কৃষ্ণবতী সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল (একজন), খুলনার ডুমুরিয়ার কাতেঙ্গা সেকেন্ডারি স্কুল (চারজন), বাগেরহাটের শরণখোলার ডিএন একতা গার্লস হাই স্কুল (দুজন), সাতক্ষীরার আশাশুনির গোদারা সেকেন্ডারি স্কুল (চারজন), খুলনার খালিশপুরের আসমা সরোয়ার ইসলামিক হাই স্কুল (চারজন), চান্দুয়া গার্লস হাই স্কুল (তিনজন), শার্শার সড়াতলা জুনিয়র হাই স্কুল (দুজন), সাতক্ষীরার বাবুরাবাদ ধুপখালী সেকেন্ডারি স্কুল (চারজন), শার্শার মুক্তিযোদ্ধা জিকেজিএস সেকেন্ডোরি গার্লস স্কুল (একজন) এবং শ্যামনগরের সাহেবখালী সিদ্দিক গাজী সেকেন্ডারি স্কুল (চারজন)।
এছাড়া দিনাজপুর বোর্ডের ১৮টি, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২৯টি এবং বরিশাল ও রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের পাঁচটি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কেউ পাস করেনি। এদের মধ্যে দুই থেকে পাঁচ পরীক্ষার্থী থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


