দেশের শিক্ষা খাতের উন্নয়নে বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের। তবে স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও এ দেশের শিক্ষা বাজেট আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষা খাতে একটি দেশের জিডিপির চার থেকে ছয় শতাংশ বা মোট বাজেটের ১৫-২০ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত। অথচ এ দেশের শিক্ষা বাজেট জিডিপির দুই শতাংশও পার হয়নি।
বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার মান এবং গবেষণার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। তাছাড়া নানা অনিয়ম-দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার কারণে বরাদ্দ অনুযায়ী সুফল পাওয়া যায়নি। তাই আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষার মান উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমান বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষা খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির পাঁচ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ করা হবে বলেও অঙ্গীকার করে দলটি। সে অনুযায়ী আসন্ন বাজেটে শিক্ষা খাতকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার বাজেটে বরাদ্দ বাড়াবে বলে প্রত্যাশা করছে সংশ্লিষ্ট সব মহল। ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
শিক্ষার মানোন্নয়নে বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর গুরুত্বের কথা জানিয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হাছানাত আলী বলেন, সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র দেশ বাংলাদেশের শিক্ষা বাজেটের প্রায় ৯০ ভাগ ব্যয় করা হয় বেতন বা অবকাঠামোর উন্নয়নে। কিন্তু শিক্ষার মানোন্নয়ন ও প্রশিক্ষণে বরাদ্দ নেই।
তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন জরুরি হলেও তা চরম অবহেলিত। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা ল্যাবের জন্য বরাদ্দ অপ্রতুল। লাইব্রেরিগুলোর মান খুবই খারাপ। এসব কারণে মেধাবীরা যেমন শিক্ষকতায় আসছেন না, তেমনি মেধা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। তাদের ধরে রাখা যাচ্ছে না।
এই শিক্ষাবিদ আরো বলেন, ইউনেস্কো যেখানে জিডিপির ছয় শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দের কথা বলছে, স্বাধীনতা-পরবর্তী আমাদের দেশে এ খাতে বরাদ্দ দুই শতাংশেও যায়নি। তবে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্ব দিয়ে প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ বরাদ্দের যে আভাস দিচ্ছে, তা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। তবে এ বরাদ্দ যেন গতানুগতিক না হয়। শিক্ষকদের মানসম্মত জীবনযাপনের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক আধুনিক গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে সুষমভাবে অর্থ বরাদ্দ, মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নিতে হবে। তাছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটানো এবং টেন্ডারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অনৈতিক প্রভাব বন্ধের আহ্বান জানান তিনি।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রসঙ্গে বলা হয়েছিল, বিএনপি দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, কর্মমুখী, উৎপাদনমুখী এবং সময়োপযোগী করে গড়ে তুলবে। বিএনপির শিক্ষানীতি হবে জীবনমুখী। শিক্ষার সব স্তরে জোর দেওয়া হবে; তবে প্রাথমিক শিক্ষায় জোর দেওয়া হবে বেশি। মৌলিক মূল্যবোধ শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করা হবে। বর্তমানে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাজমান নৈরাজ্য দূর করে নিম্ন ও মধ্য পর্যায়ে চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
এতে আরো বলা হয়, শিক্ষা খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির পাঁচ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ করা হবে। এই অর্থ কেবল ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে নয়, বরং শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে, বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষকের শিক্ষাদানের মান ও দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া হবে। তাদের যথাযথ ট্রেনিং দেওয়া হবে। প্রযুক্তি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাসামগ্রীর উন্নয়নে জোর দেওয়া হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে ভবিষ্যতে ক্রমান্বয়ে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হবে।
শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গণসাক্ষরতা অভিযানের পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রাক-বাজেট আলোচনায় শিক্ষা খাতে বর্তমান বাজেট পরিস্থিতি তুলে ধরে বরাদ্দ বাড়ানোসহ বিভিন্ন দাবি জানানো হয়।
এতে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিক্ষা খাতে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। শিক্ষার বর্তমান মান আন্তর্জাতিক মানের ধারেকাছেও নেই। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অগ্রগতির জন্য যে পরিমাণ বাজেট দরকার, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ এখনো সবচেয়ে কমগুলোর একটি।
তবে নতুন সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে পর্যায়ক্রমে জিডিপির পাঁচ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের যে অঙ্গীকার রয়েছে, তা ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রে শিক্ষার সব স্তরে সামগ্রিকভাবে সংস্কারের মাধ্যমে মানোন্নয়নের জন্য আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে অন্তত জিডিপির আড়াই শতাংশ, তিন বছরের মধ্যে পাঁচ শতাংশ এবং পাঁচ বছরের মধ্যে ছয় শতাংশে বরাদ্দ উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া উচিত বলে তারা মনে করেন। পাশাপাশি শিক্ষা খাতের বাজেটকে কেবল ব্যয় বরাদ্দ হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তারা।
এ প্রসঙ্গে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষা খাতের বাজেটকে কেবল বরাদ্দ হিসেবে দেখা যাবে না, বিনিয়োগ হিসেবে দেখবে হবে।
শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানানো হয় জাতীয় সংসদ অধিবেশনেও। এ বিষয়ে গত ৩০ এপ্রিল প্রথম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আসন্ন বাজেটে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। আগামী বাজেটে এ দুই খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হোক। গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ না দিলে দেশ এগোবে না।
একই দিন সংসদে শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, জিডিপির বড় অংশ শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হবে। তিনি বলেন, আমরা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের সম্মানী বাড়ানোর চেষ্টা করছি, যাতে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে তারা মনোযোগ দিতে পারেন।
শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জিডিপির পাঁচ শতাংশ শিক্ষা খাতের বাজেট উন্নীতের ঘোষণা নির্বাচনি এজেন্ডায় বলেছেন এবং সে ব্যাপারে কাজ করার জন্যও আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু আমরা প্রথমবারই পাঁচ শতাংশ বাড়িয়ে দিতে পারব না। তবে আমি চাই, এবার আমরা কিছুটা এগিয়ে যাই এবং সেটা আমাদের করতে হবে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে ৯৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

