বাংলাদেশে ইসলামি আন্তঃব্যাংক বাজার চাই

এম. কবির হাসান

বাংলাদেশে ইসলামি আন্তঃব্যাংক বাজার চাই

বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংকিংয়ের কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে গবেষণা শুরু করেছি বহুকাল আগে। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং কীভাবে কাজ করছে—তার একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ আমিই প্রথমদিকে প্রকাশ করেছিলাম এবং সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংককে সুদমুক্ত মুদ্রাবাজার পণ্য চালুর সুপারিশ করেছিলাম। পঁচিশ বছর পর এসে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা দিচ্ছে যে, আগামী ৩০ জুনের মধ্যে তারা একটি ইসলামি আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার চালু করবে। প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল—অবশেষে! দ্বিতীয় চিন্তা—কিন্তু এভাবে নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণা ইসলামি ব্যাংকিংয়ের একটি গুরুতর সীমাবদ্ধতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রচলিত ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি ধার নিতে যে কল-মানি বাজার ব্যবহার করে, তা সুদভিত্তিক বলে শরিয়াহ-নিষিদ্ধ; ফলে ইসলামী ব্যাংকগুলো এতে অংশ নিতে পারে না। তাদের একমাত্র বিকল্প বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট বন্ড (বিজিআইআইবি), যা বহু বছর নিষ্ক্রিয়। দিনের মধ্যভাগে কোনো ব্যাংকের চলতি হিসাব ওভারড্রাফটে যেতেই পারে; কিন্তু রাতভর ওভারড্রাফট থেকে গেলে অতিরিক্ত রিজার্ভধারী অন্য ইসলামী ব্যাংক থেকে ধার নেওয়ার কোনো সংগঠিত পদ্ধতি নেই। এটি প্রকৃত একটি পরিচালনাগত সংকট এবং সঠিকভাবে কাঠামোবদ্ধ একটি আন্তঃব্যাংক বাজারই এর সমাধান হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু প্রস্তাবিত সমাধানটি এমনভাবে তৈরি, যেন প্রায় দুই বছর ধরে এই খাতে যে বিপর্যয় চলছে—তা আমলেই নেওয়া হয়নি। যেসব ব্যাংকের ইক্যুইটি ঋণাত্মক, যাদের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ ঝুলছে এবং যাদের খেলাপি ঋণের হার ৯০ শতাংশের কাছাকাছি—সেসব ব্যাংকের মধ্যে তরলতার পাইপলাইন বসানো যায় না। এটি তরলতা ব্যবস্থাপনা নয়; এটি শরিয়াহসম্মত মোড়কে সংক্রমণ ঝুঁকির সঞ্চারণ।

কেনাবেচার মতো কিছু না থাকলে বাজারে ব্যবসা চলে না

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, তারা মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও বাহরাইনের মডেল পর্যালোচনা করেছে। তবে মনে হচ্ছে, ভুল শিক্ষাটিই তারা গ্রহণ করেছে। ১৯৯৪ সালে চালু হওয়া মালয়েশিয়ার ইসলামি আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারের সাফল্যের ভিত্তি ছিল সুনির্দিষ্ট কিছু পণ্য—ব্যাংক নেগারার বিনিয়োগ ইস্যু, ব্যাংক নেগারা মনিটারি নোট, বিক্রয়-পুনঃক্রয় চুক্তি ও কমোডিটি মুরাবাহা চুক্তি। প্রতিটি পণ্যই বাস্তব সম্পদের সমর্থনপুষ্ট ছিল এবং ব্যাংক নেগারার একটি কেন্দ্রীয় শরিয়াহ উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্তের আওতাধীন ছিল। ইসলামি লেনদেনের জন্য ব্যাংক নেগারা একটি পৃথক নিষ্পত্তি ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছিল, যাতে এই অর্থ প্রচলিত অর্থ থেকে শারীরিকভাবেই আলাদা থাকে।

বাংলাদেশের কাছে এর কোনোটিই নেই। কোনো শরিয়াহসম্মত সরকারি সিকিউরিটি সক্রিয়ভাবে ইস্যু হচ্ছে না। কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুকুক নেই। কোনো ইসলামি ট্রেজারি বিল নেই। প্রস্তাবিত আন্তঃব্যাংক বাজার মূলত ব্যাংকগুলো দ্বিপক্ষীয়ভাবে মুদারাবা শর্তে অজামানতি তহবিল রাখার সুযোগ দেবে। এটি দ্বিপক্ষীয় ঋণদান, পরিচালনযোগ্য মুদ্রাবাজার নয়। প্রকৃত মুদ্রাবাজার হিসেবে কাজ করতে হলে বাজারে লেনদেনযোগ্য কাগজ থাকতে হয়। সেটি ছাড়া মূল্য আবিষ্কার নেই, ভিত্তি হার নেই, সেকেন্ডারি বাজারের কর্মকাণ্ডও নেই। আমার সম্পাদিত গ্রন্থ The Handbook of Islamic Banking (অ্যাডওয়ার্ড এলগার, ২০০৭)-এ স্যাম হাকিম ইসলামি মুদ্রাবাজার পণ্যের কাঠামো বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত তা পর্যালোচনা করা। পণ্যকে আগে আসতে হবে; বাজার তার পরে।

মূল সমস্যাটি হলো—এই খাত এখনো চরম অসুস্থ। গত বছর রাজনৈতিক প্রভাবে দেওয়া ঋণের ভারে ব্যালান্স শিট ভেঙে পড়ার পর পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে গঠন করা হয় ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’। এক প্রতিবেদন বলছে, এস আলম গ্রুপ একাধিক শেল কোম্পানি ও অভ্যন্তরীণ ঋণের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড থেকে প্রায় ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি ছিল পাচার হওয়া অর্থ। ২০২৪ সালের শেষে ইসলামী ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (CAR) দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশে।

মোল্লা, ফারুক ও মোবারকের সঙ্গে সম্পন্ন আমার গবেষণায় (Journal of Financial Services Research, খণ্ড ৫১, সংখ্যা ২/৩, ২০১৭) প্রমাণিত হয়েছে—শরিয়াহ বোর্ডের সুশাসনের মান ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ঝুঁকির ফলে স্পষ্ট ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ আমাদের সেই গবেষণার বিপরীত প্রমাণ হাজির করেছেÑদেখিয়েছে কীভাবে শরিয়াহ বোর্ডকে উপেক্ষা করা যায়, কীভাবে পরিচালনা পর্ষদ একটি মাত্র শিল্পগোষ্ঠীর হাতিয়ারে পরিণত হয় এবং প্রতিটি ব্যাংককে লুটপাটের যানে রূপান্তর করে। আন্তঃব্যাংক বাজার এই সমস্যার সমাধান নয়; বরং এটি দুর্বল সুশাসনের ব্যাংকগুলোর জন্য তহবিল সংগ্রহের আরো একটি পথ খুলে দেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক স্বয়ং স্বীকার করেছে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পক্ষে আন্তঃব্যাংক অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হবে; কারণ প্রতিপক্ষ ব্যাংকগুলো এর পরিশোধ-সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। যদি বাংলাদেশ ব্যাংক এটি সঠিক বলে মনে করে, তবে এই বাস্তবতা প্রতিফলিত হয় এমন রক্ষাকবচ বাজারের নকশায় কেন রাখা হয়নি? অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর জন্য মূলধন পর্যাপ্ততার মানদণ্ড কেন নেই? প্রতিপক্ষ-এক্সপোজারের সীমা কেন নির্ধারিত হয়নি?

যা করতে হবে

আমি আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার প্রতিষ্ঠার বিরোধী নই; আমি শুধু মনে করি, এটি যেন শূন্যতার মধ্যে না হয়। বাজার চালুর আগে; কিংবা একই সঙ্গে, কয়েকটি শর্ত পূরণ অপরিহার্য।

প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় পণ্যগুলো তৈরি করতে হবে। মুরাবাহা বা ইজারাহভিত্তিক কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিকিউরিটি ইস্যু করতে হবে, যেগুলো ইসলামী ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ, লেনদেনযোগ্য কাগজ এবং অন্য লেনদেনের জামানত হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। এসব পণ্য না থাকা পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের কেনাবেচার মতো কিছুই থাকছে না।

দ্বিতীয়ত, অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর জন্য যোগ্যতার শর্ত নির্ধারণ করতে হবে। ন্যূনতম মূলধন পর্যাপ্ততার মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ ব্যাংকগুলো অজামানতি আন্তঃব্যাংক ঋণগ্রহণের অযোগ্য ঘোষিত হবে। সফল আন্তঃব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেÑএমন প্রায় সব দেশেই এ ধরনের সীমাবদ্ধতা চালু আছে।

তৃতীয়ত, ইসলামি লেনদেনের ক্লিয়ারিং প্রক্রিয়া প্রচলিত লেনদেনের প্রক্রিয়া থেকে শারীরিকভাবে পৃথক রাখতে হবে। মালয়েশিয়া এই প্রয়োজনীয়তা ৩০ বছর আগেই উপলব্ধি করেছিল।

চতুর্থত, এই আন্তঃব্যাংক বাজারের জন্য স্বতন্ত্র ও কার্যকর শরিয়াহ তদারকি ব্যবস্থা থাকতে হবে। বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণকাঠামো নিয়ে আমাদের পর্যালোচনায় (Thunderbird International Business Review, গ্রীষ্ম ২০০৭) দেখা গিয়েছিলÑসে সময় বিশেষায়িত শরিয়াহ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ঘাটতি ছিল অত্যন্ত প্রকট। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি কেন্দ্রীয় শরিয়াহ উপদেষ্টা বোর্ড গঠন করেছে—এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে একটি কার্যকর ইসলামি আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার কীভাবে কাজ করে, তার শরিয়াহ কাঠামো, পণ্য নকশা, তারল্য ব্যবস্থাপনা, লেনদেন নিষ্পত্তি, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড—এসব বিষয়ে বোর্ডের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরো সম্প্রসারণ করা জরুরি। নতুন আন্তঃব্যাংক বাজার যেন অতীতের নিয়ন্ত্রণগত দুর্বলতা বহন না করে; বরং শক্তিশালী শরিয়াহ তদারকি ও বাস্তবভিত্তিক বাজার-জ্ঞানকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।

সবশেষে, এই উদ্যোগকে সামগ্রিক সংস্কার কর্মসূচি থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্সের প্রবর্তন; বাংলাদেশ ব্যাংককে অধিক স্বাধীনতা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের সংশোধন; দুর্দশাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং একটি ইসলামি ব্যাংকিং আইনপ্রণয়ন—এসবই কার্যকর বাজার গড়ে তোলার পূর্বশর্ত। ক্রম গুরুত্বপূর্ণ।

বিষয়টি বিমূর্ত নয়

বাংলাদেশের মোট আমানতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইসলামি ব্যাংকিংয়ে। এই অর্থ কোটি কোটি মানুষের, যারা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে এই ব্যাংকগুলো বেছে নিয়েছিলেন। রাজনৈতিক যোগসাজশে কিছু চক্র ব্যাংকগুলো কুক্ষিগত করে তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই আস্থা পুনরুদ্ধার করতে চায়। সঠিকভাবে আন্তঃব্যাংক বাজার প্রতিষ্ঠা সেই আস্থা পুনরুদ্ধারের অংশ হবে; ভুলভাবে করা হলে তা হবে ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আরোপিত আরেক স্তরের জটিল আর্থিক কাঠামো।

বাংলাদেশ ব্যাংক মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও বাহরাইনের মডেল পর্যালোচনা করেছে। তিন দেশের শিক্ষা একই—আগে পণ্য গড়ো, সুশাসন গড়ো, তদারকি গড়ো; তারপর বাজার খোলো। ভিত শক্ত করো; বাজার তার ওপরে আপনা-আপনি দাঁড়াবে। বাংলাদেশের আমানতকারীরা ব্যাংকারদের অযোগ্যতার ফল আর একটি ব্যর্থতা সইবার অবস্থায় নেই।

লেখক : নিউ অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং ইসলামি ব্যাংকিং ও অর্থায়নে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক পুরস্কারের (২০১৬) প্রাপক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন