পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ভূমিধস বিজয় এই প্রদেশটির রাজনৈতিক উত্থানপতনের এক বিচিত্র রূপ আমাদের সামনে ফুটে উঠেছে। বলা যায়, তিন পর্বের কথিত সেক্যুলার, বাম ও মধ্যপন্থি এবং অতঃপর চতুর্থ পর্বে উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান মূলত ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ধ্বংসের ইঙ্গিত বহন করছে। একই সঙ্গে বিজেপির এই বিজয় পশ্চিমবঙ্গের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও সংস্কৃতির জন্য যেমন অশনিসংকেত, তেমনি বাংলাদেশ সীমান্তে আরএসএস জঙ্গি উত্থানের বিষয়টিও প্রণিধানযোগ্য। বলা যায়, আসামের পর পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এ বিজয় বাংলাদেশের সুদীর্ঘ সীমান্তজুড়ে বৈরী পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা তীব্র হয়ে উঠেছে।
এখানে উল্লেখ করতে হয়, ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে তিনটি রাজনৈতিক দল একের পর এক শাসন করে এসেছে। প্রথমে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত— অর্থাৎ ত্রিশ বছর, বামপন্থি দল সিপিআইএম ১৯৭৭ সব থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৩৪ বছর এবং সর্বশেষ তৃণমূল কংগ্রেস গত ১৫ বছর শাসন করেছে। এখন বিজেপির শাসন শুরু হতে যাচ্ছে। আর বিজেপি হচ্ছে, আরএসএসের উগ্র হিন্দুত্ববাদী জঙ্গি সংগঠনের রাজনৈতিক শাখা। অন্যভাবে বলা যায়, বিজেপির আদর্শিক অভিভাবক বা মাতৃ সংগঠন হচ্ছে আরএসএস।
ইতিহাসটা হচ্ছে এমনÑভারতকে একান্তভাবে হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে আরএসএস একটি রাজনৈতিক শাখা গঠনের কথা অনুভব করলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ১৯৫১ সালে জনসংঘ নামক একটি দল গঠিত হয়। আর শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন কংগ্রেস নেতা এবং নেহরু মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য। পরে ১৯৮০ সালে এই জনসংঘই রূপান্তরিত হয়ে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) পরিণত হয়। তাই আমরা দেখতে পাই, বিজেপির অধিকাংশ শীর্ষ নেতার ভিত্তি তৈরি হয়েছে আরএসএস থেকে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, অটল বিহারি বাজপেয়ি ও লাল কৃষ্ণ আদভানির মতো নেতা আরএসএসের তৈরি।
অন্যদিকে আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার মূলত বিনায়ক দামোদর সাভারকারের হিন্দুত্ব দর্শনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ভারতকে একটি হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯২৫ সালে আরএসএস নামক উগ্র হিন্দুত্ববাদী এই সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। হেডগেওয়ারের কাছে হিন্দুরাষ্ট্র হলো এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে হিন্দু মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি হবে জাতীয় ঐক্যের প্রধান চালিকাশক্তি। আর বিনায়ক দামোদর ছিলেন একজন উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতা, যিনি একসময় হিন্দু মহাসভারও সভাপতি ছিলেন।
যাই হোক, এই ঐতিহাসিক পটভূমিতে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর সারা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির কর্মীরা যে প্রতিশোধমূলক হিংসাত্মক ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে, তাকে বলা হয় বুলডোজার রাজনীতি। এই বুলডোজার দিয়ে ভাঙা হচ্ছে মসজিদ, দোকানপাট, ঘরবাড়ি ইত্যাদি। মূলত উত্তর ভারতে বুলডোজার দিয়ে মুসলমানদের বাড়িঘর ভাঙার যে দৃশ্য প্রায়ই দেখে থাকি, সেটাই বুলডোজার রাজনীতি হিসেবে অভিহিত হয়েছে। সেই বুলডোজারের ধ্বংসাত্মক কার্যাবলি চলছে এখন পশ্চিমবঙ্গে। কারণ আরএসএস, তথা বিজেপি পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র রাজনৈতিক দল, যে দলটি শুধু মুসলিম ঘৃণা ও বিদ্বেষের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই দলটির নেতাকর্মীরা মুসলমানদের কতটা ঘৃণা করে, তার উদাহরণ হচ্ছেÑসামান্য গরুর গোশত রাখার অপরাধে এই সংগঠনের গোলরক্ষকরা এ পর্যন্ত ২৮ মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যা করেছে এবং তাদের হাতে আহত হয়েছে ১২৪ জনের মতো।
তাই নির্বাচনে বিজয়ের পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিজেপির হিংসাত্মক তৎপরতা আমাদের ১৯৬৪ সালে দাঙ্গার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কথিত সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার প্রতিশোধ হিসেবে কলকাতায় মুসলমানদের ওপর ব্যাপক আক্রমণ চালানো হয়েছিল। পুরোনো ইতিহাস, বিশেষ করে তখনকার বিবিসির একটি প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে, সেই দাঙ্গায় শতাধিক মুসলমান নিহত হয়েছিলেন, ৭০ হাজার মুসলমান ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন। ৫৫ হাজার মুসলমানকে খোলা আকাশের নিচে রাত্রিযাপন করতে হয়েছিল। সেটি ছিল মুসলমানদের ওপর একতরফা আক্রমণ, যেটি এই ২০২৬ সালে নির্বাচনের পর আমরা সেই পশ্চিমবঙ্গেই দেখতে পাচ্ছি।
১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার অজুহাত দেখিয়ে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছিল। এবার ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে মুসলমানরা তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছে এই অজুহাতে মুসলমানদের ওপর ভয়াবহ আক্রমণ শুরু করা হলো। যদিও এখন পর্যন্ত হতাহতদের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তবে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ চলছে নানাভাবে। বুলডোজার দিয়ে ভাঙচুর করার পাশাপাশি ঘরবাড়ি, দোকানপাট জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সহিংসতা চরমপর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সেখানে মুসলমানরা চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিন যাপন করছে। ৬৪-এর দাঙ্গা যারা দেখেছেন, তাদের অনেকে এখনো বেঁচে আছেন। তারা বহন করছেন সেই ভয়াবহ দিনগুলোর স্মৃতি। ফলে বর্তমান ঘটনায় তারা আরো বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
এ প্রসঙ্গে একটু বলে রাখা দরকার, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর গত ৫৫ বছর যতগুলো জাতীয় নির্বাচন হয়েছে, এর সবগুলোয় সংখ্যালঘু হিন্দুরা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে। কিন্তু কখনোই নির্বাচনে আওয়ামী লীগবিরোধীরা জয়লাভের পর সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর প্রতিশোধমূলক আক্রমণের ঘটনা ঘুটতে দেখা যায়নি। অথচ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সেটি করছে অত্যন্ত নগ্নভাবে ।
এদিকে এ সত্য এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার ও নির্বাচন কমিশন বড় ধরনের কারচুপির আশ্রয় নিয়েছে। খুবই পরিকল্পনাভাবে সবকিছু করা হয়েছে। যেমন নির্বাচনের আগে নানা অজুহাত দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে ৯১ লাখ ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি ভোটার হওয়ার মতো বয়স হয়েছে এমন তরুণদের ভোটার করা হয়নি। এ সম্পর্কে সেখানকার একজন সাবেক বিচারক স্পষ্টভাবে বলেছেন, ভোটার হওয়ার মতো এমন প্রাপ্তবয়স্ক কোনো যুবককে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া কিংবা সংযুক্ত না করা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক। এই পরিপ্রেক্ষিতে কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধী এক বিবৃতিতে বিজেপি সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে চোর বলে অভিহিত করেছেন, যা বর্তমান পরিস্থিতিকে অন্য এক মাত্রায় নিয়ে গেছে।
এখানে উল্লেখ করতে হয়, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ৯১ লাখ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং অন্যান্য পন্থায় কারচুপির মাধ্যমে বিজেপি বিশাল জয় পেলেও প্রাপ্ত ভোটের মধ্যে মাত্র ১২ লাখ ভোট বেশি পেয়েছে বিজেপি। যেসব ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো থাকলে বিজেপির ভরাডুবি হতো নিশ্চিতভাবে। অন্যদিকে সামগ্রিক হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে, পুরো ভারতে বিজেপি এখন পর্যন্ত ৩৭ শতাংশ ভোটের ওপর যেতে পারেনি। এ থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, ভারতের ৬৩ শতাংশ মানুষ বিজেপির বিরুদ্ধে রয়েছে। এখন সেখানে যদি গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে কংগ্রেসসহ সব রাজনৈতিক দল একমঞ্চে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলনে নেমে পড়ে, তখন পরিস্থিতিটা সম্পূর্ণ উল্টে যাবে। রাহুল গান্ধীর বিবৃতির পর পরিস্থিতি সেদিকে এগোচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

