আমন মৌসুম শুরু হয়েছে। এ সময় কৃষকের সারের চাহিদাও বাড়ছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও সার কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। কোথাও আবার ডিলারের গুদাম থেকে সার লুটের ঘটনাও ঘটেছে।
রাজশাহীর দুর্গাপুরের কৃষক তোরাপ শেখের অভিজ্ঞতা এই পরিস্থিতিরই চিত্র তুলে ধরে। তিনি বলেন, পাঁচ বিঘা জমির জন্য পাঁচ বস্তা সার প্রয়োজন হলেও দেওয়া হচ্ছে এক বস্তা। সকালে সার প্রয়োজন হলেও তা মিলছে দুপুরে।
ঝিনাইদহের কৃষক মোহাম্মদ জনিও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, খুচরা দোকানে সার পাওয়া গেলেও বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন মেটাতে বাধ্য হয়ে বেশি দামেই সার কিনতে হচ্ছে।
অন্যদিকে ডিলারদের দাবি, চাহিদার তুলনায় তারা পর্যাপ্ত সার পাচ্ছেন না। ফলে তারাও চাপের মধ্যে রয়েছেন।
রাজশাহীর এক সার ডিলার জানান, আগের তুলনায় তারা কম সার পাচ্ছেন। এ মাসে তিনি ৬০ বস্তা টিএসপি, বিএডিসির ৬০ বস্তা ডিএপি, ৭০ বস্তা বাংলা সার এবং ৮০ বস্তা পটাশ পেয়েছেন। ইউরিয়া থাকলেও অন্য কয়েক ধরনের সারের সংকট রয়েছে বলে জানান তিনি।
সরকারের দাবি, সংকট নেই
মাঠপর্যায়ে এমন পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার বলছে, দেশে সারের সংকট নেই। বরং চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।
মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, দেশে বর্তমানে মোট ১৩ দশমিক ৬৫ লাখ টন সার মজুদ আছে।
এর মধ্যে ইউরিয়া ৪ দশমিক ৮২২ লাখ টন, টিএসপি ৩ দশমিক ৬৯ লাখ, ডিএপি ৩ দশমিক ৬৮ লাখ এবং এমওপি ১ দশমিক ৪৬ লাখ টন।
এ ছাড়া ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাতে আরো সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। উপদেষ্টা জানান, ২ লাখ ১০ হাজার টন টিএসপি, ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিএপি এবং ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন এমওপি আমদানির পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, ২৪ আগস্ট সরকারি ক্রয় কমিটির বৈঠকে আরো ৩ লাখ ৬৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর এক সপ্তাহ আগে কানাডা, রাশিয়া ও সৌদি আরব থেকে আরো ১ লাখ ১৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
তবে সার বিতরণে কিছুটা অনিয়ম রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন জাহেদ উর রহমান। কৃষক ও জনগণের স্বার্থে সরকার বিতরণব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনছে বলেও জানান তিনি।
সার উত্তোলন ও বিতরণের বিষয়ে ডিলারদের সতর্ক করা হয়েছে। পাশাপাশি সার উত্তোলন, বিতরণ ও ডিলার নিয়োগের কার্যক্রম পর্যালোচনায় তিন সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটির সদস্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, বিদ্যমান ডিলারশিপ বাতিল না করে ডিলারদের কমিশন বাড়ানোর বিষয়টি পর্যালোচনা করছে সরকার।
অন্যদিকে বুধবার লালমনিরহাটে এক অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই। সার নিয়ে যতটা বাস্তব সংকট, তার চেয়ে বেশি রটনা হচ্ছে।
সার বিতরণব্যবস্থা আরো গতিশীল করতে প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে অতিরিক্ত ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম?
সরকারের এই বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন কৃষি অর্থনীতিবিদেরা। তাদের প্রশ্ন, মজুদ পর্যাপ্ত থাকলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার পাওয়া যাচ্ছে না কেন এবং কৃষকদের বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে কেন?
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইদুর রহমান মনে করেন, সারের মজুদের ঘাটতির প্রভাবই মাঠপর্যায়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, আমন মৌসুম মাত্র শুরু হয়েছে। সামনে আরো দেড় থেকে দুই মাস কৃষকদের নিরবচ্ছিন্নভাবে সার প্রয়োজন হবে। এরই মধ্যে যদি সরবরাহে সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে কিছুদিন আগের জ্বালানি তেল সংকটেরও তুলনা করেন তিনি। তার ভাষ্য, সরকার তখনও ঘাটতি নেই বলেছিল, কিন্তু পাম্পে গিয়ে মানুষ তেল পায়নি।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডলের মতে, প্রয়োজনের তুলনায় সার সরবরাহ যে অপ্রতুল, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে দেশে যতটুকু সার রয়েছে, সেটির সুষ্ঠু বিতরণ ও ব্যবস্থাপনাও হচ্ছে না।
কুড়িগ্রামে ডিলারের গুদাম ভেঙে সার লুটের ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, কৃষকের কাছে পর্যাপ্ত সার পৌঁছালে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা নয়।
বিপণন ব্যবস্থায় নতুন চক্র?
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সারা দেশে সার বিপণনব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ। তাদের আশঙ্কা, ডিলারশিপসহ সার বিপণনের বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন চক্রের আবির্ভাব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, আগে একটি মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী ছিল। এখন নতুন একটি গোষ্ঠী এই ব্যবস্থায় ঢুকেছে। নতুন মৌসুমকে তারা সুযোগ হিসেবে নিয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তার মতে, বাজার ব্যবস্থাপনায় অস্থিরতা তৈরি হলে কৃষকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ে। সঠিক সময়ে সার না পাওয়ার আশঙ্কায় অনেকে ভবিষ্যতের জন্য সার মজুত করে রাখতে পারেন। এতে পরিস্থিতি আরো জটিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কোথায় কত সার, তা প্রকাশের দাবি
কৃষি অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন, সারের মজুদ ও বিতরণ নিয়ে স্বচ্ছতা বাড়ানো জরুরি। কোন উপজেলায় কত সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা প্রকাশ্যে জানানো হলে পরিস্থিতি নিয়ে বিভ্রান্তি কমবে।
অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডলের মতে, কোন উপজেলায় কত বরাদ্দ রয়েছে, তা সবাই জানতে পারলে এবং সেই অনুযায়ী সার সরবরাহ করা হলে ডিলার বা অন্য কোনো পর্যায়ে সার মজুত করে রাখার অভিযোগও কমবে।
বাংলাদেশে সারের চাহিদা মেটাতে প্রতি বছরই বড় পরিমাণে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট সারের চাহিদার প্রায় ৮৩ শতাংশ আমদানি করতে হয়েছে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন রাসায়নিক সারের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া সারের চাহিদাই প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ টন।
ফলে সরকারি হিসাবে মজুদ পর্যাপ্ত থাকলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকের হাতে সময়মতো সার পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম
‘‘‘‘‘‘‘‘‘‘‘‘
নেপালে হিমবাহ ধসে ধুয়ে-মুছে গেছে একের পর এক জনপদ, নিখোঁজ অন্তত ৩০০ ভারতীয়: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
নেপালের রাসুয়া অঞ্চলে আঘাত হানা বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬০ জনে দাঁড়িয়েছে। কাদা ও পানির তীব্র স্রোতে চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে একের পর এক জনপদ। এতে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন হাজার হাজার মানুষ, যার মধ্যে অন্তত ৩০০ জন ভারতীয় নাগরিক বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির সরকার।
বৃহস্পতিবার কাঠমান্ডুতে আয়োজিত ‘এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড আন্বিক্ষা সামিট’-এ অংশ নিয়ে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেন, ‘মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একের পর এক শহর ও গ্রাম পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। হাজার হাজার পরিবার রাতারাতি গৃহহীন হয়ে পড়েছেন এবং বহু মানুষের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এই দুর্যোগের পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কতটা, তা নিরূপণে আমরা এখনো নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
নিখোঁজ ৫০০ বিদেশি, যার ৩০০ জনই ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, নেপালে আকস্মিক বন্যায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৩০০ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের একটি বড় অংশ মানস সরোবর যাত্রার উদ্দেশ্যে তিব্বতমুখী রুট ব্যবহার করছিলেন।
শিশির খানাল বলেন, ‘দুর্গত পথটি মূলত বিদেশি তীর্থযাত্রীরা মানস সরোবর যাওয়ার কাজে ব্যবহার করেন। নিখোঁজ এই ৩০০ ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপনের জোর চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার।’ তিনি আরও জানান, সব মিলিয়ে বর্তমানে অন্তত ৫০০ জন বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না।
নিখোঁজ বিদেশিদের সুরক্ষায় বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের সঙ্গে কাঠমান্ডু সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নিজের দেশের নাগরিকদের মতোই বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিতে নেপাল সরকার পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
উদ্ধারকাজ ও ভারতের সহায়তা এই আকস্মিক বন্যাকে হিমালয় কন্যা নেপালে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ হিসেবে আখ্যা দেন শিশির খানাল। দ্রুত ত্রাণ সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি ভারত সরকারের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো আটকে পড়াদের উদ্ধার করা এবং জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া। বিশ্বের বহু দেশ নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে। ভারত সরকার ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় ত্রাণ পাঠিয়েছে, যার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।’
পর্যটকদের নেপাল সফরের আহ্বান দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় বৈশ্বিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এই বন্যার কারণে নেপালের সামগ্রিক পর্যটন খাত থমকে যায়নি।
শিশির খানাল বলেন, ‘জরুরি ত্রাণ সরবরাহের পাশাপাশি বিশ্বের সঙ্গে নেপালের যোগাযোগ অব্যাহত থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। আমাদের অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়াতে পর্যটন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমি সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই, নেপালের বড় একটি অংশ এখনো পুরোপুরি নিরাপদ ও প্রভাবমুক্ত। পোখারা কিংবা মাউন্ট এভারেস্ট অঞ্চল আগের মতোই পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।’
আন্তর্জাতিক পর্যটকদের নেপাল সফর অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পর্যটকদের ব্যয় করা অর্থ আগামী কয়েক মাসে দেশটিকে নতুন করে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। অতীতের বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার উদাহরণ টেনে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ‘২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পরও নেপাল যেভাবে শক্তিশালী হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, এবারও সব কাটিয়ে আমরা ঠিকই পুনর্গঠন সম্পন্ন করব।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


