যুদ্ধের ভাষা যেখানে হুমকি আর শক্তি প্রদর্শনের, সেখানে কখনো কখনো সুর হয়ে ওঠে প্রতিবাদ, জানায় শান্তির আহ্বান। ইরানের সংগীতশিল্পী আলি ঘামসারি সেই বিরল পথ বেছে নিয়েছেন। তেহরানের কাছে অবস্থিত দামাভান্দ বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। স্থাপনাটিকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে সাম্প্রতিক উত্তেজনা।
তবে সে উত্তেজনার মাঝেই ঘামসারি হাজির হন একেবারে ভিন্ন এক বার্তা নিয়ে। কোনো স্লোগান নয়, কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; একটি চাটাই আর হাতে পারস্য শাস্ত্রীয় সংগীতের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র ‘তার’। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামনে বসে তিনি বাজাতে শুরু করেন শান্ত, ধীর বেদনার্ত সুর, যেন অস্থির সময়ের ভেতর বলছে থামো! মানুষ কাঁদছে, মানুষ মরছে, শান্ত হও!
ভিডিওটিতে দেখা যায়, চারপাশের শিল্প অবকাঠামোর কঠোরতার বিপরীতে তার সুর তৈরি করছে অদ্ভুত এক কোমলতা। খুব দ্রুত সে দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে সামাজিকমাধ্যমে, হয়ে ওঠে আলোচনার কেন্দ্র।
আলি ঘামসারি ইরানের সমসাময়িক সংগীত জগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি শুধু একজন ‘তার’-বাদকই নন, একজন সুরকার হিসেবেও পরিচিত। পারস্য শাস্ত্রীয় সংগীতকে নতুন প্রজন্মের কাছে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার জন্য তার কাজ বিশেষভাবে প্রশংসিত। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেলে তিনি তৈরি করেছেন নিজস্ব এক সংগীতভাষা। তার এ পারফরম্যান্সও যেন সে ধারারই অংশ, যেখানে সংগীত কেবল শিল্প নয়; হয়ে ওঠে অবস্থান নেওয়ার একটি মাধ্যম।
ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমি এখন দামাভান্দ বিদ্যুৎকেন্দ্রে আছি। এটি এমন একটি স্থান, যেটি হামলার হুমকির মুখে; যা আমি চাই না ঘটুক। আমি আশা করি, আমার তারের সুর শান্তির বার্তা বহন করবে এবং মানুষের ঘরের আলো নিভে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি তেহরানের একটি বড় অংশের বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। ফলে এর নিরাপত্তা শুধু অবকাঠামোগত নয়, নাগরিক জীবনের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দেন এবং একটি সময়সীমাও নির্ধারণ করেন। তার বক্তব্যে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে কূটনৈতিক পর্যায়ে অগ্রগতির মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির ঘোষণাও আসে, যা সাময়িক স্বস্তি এনে দেয়।
তবে এসব রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বাইরে দাঁড়িয়ে আলি ঘামসারির সুর যেন অন্য এক সম্ভাবনার কথা বলে, যেখানে সংঘাতের বিপরীতে আছে সংস্কৃতি, ধ্বংসের বিপরীতে সৃজনশীলতা আর বিভাজনের বিপরীতে আছে মানবিক সংযোগ। দামাভান্দ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামনে বসে বাজানো সেই ‘তার’-এর সুর কেবল সংগীত নয়, এটি এক নীরব প্রশ্ন, এক কোমল প্রতিবাদ এবং হয়তো এক আশাবাদের ইঙ্গিত।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

