জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৫ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ বছর স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, চিকিৎসা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ক্রীড়া, পল্লী উন্নয়ন, সমাজসেবা, জনপ্রশাসন, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সংগীতশিল্পী বশির আহমেদকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা করা হয়।
প্রিয় শিল্পীর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তির খবরে সামাজিকমাধ্যমে আনন্দ ও আবেগ প্রকাশ করেছেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা। গত শুক্রবার বশির আহমেদের ছবি পোস্ট করে তিনি ক্যাপশনে লেখেন, ‘ওস্তাদজী, সুরের উত্তরসূরি হিসেবে আপনার এই সম্মান আমার হৃদয়ের গভীরে ছুঁয়ে গেল। জানি না আপনি জানতে পারছেন কি না; কিন্তু আপনার এই সম্মানে আমাদের গর্বে বুক ভরে গেছে। আল্লাহ আপনাকে ও ওস্তাদমাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের উচ্চ মাকাম দান করুন। রব্বির হামহুমা কামা রব্বা ইয়ানি সগিরা।’
কনকচাঁপার এই পোস্টে ওয়াসেক মুত্তাকিনুর রহমান নামে একজন লিখেছেন, ‘তিনি একজন সুরস্রষ্টা। একজন হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া কণ্ঠশিল্পী। বাংলা ও উর্দু মিলে তার গাওয়া গানগুলো এক অদ্ভুত সুরসাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তাকে আমরা যেন ভুলে না যাই। এ পুরস্কার যদি তিনি বেঁচে থাকা অবস্থায় পেতেন, তবে সেটা আরো অনেক আনন্দের হতো। তবুও তাকে সম্মানিত করায় সরকারকে কৃতজ্ঞতা জানাই। আমরা আপনার গানেও তাকে খুঁজে পাই আপা। মানুষের গান আমি শুনিয়ে যাবো, তিনি জনমানসের শিল্পী ছিলেন।’
পাপলু ইকরাম লিখেছেন, ‘অনেক দেরি হয়ে গেল, এসব সম্মান-স্বীকৃতি-সম্মানি বেঁচে থাকতেই দেওয়া উচিত। এখন এই স্বীকৃতিতে কিছু আসে যাবে না তার; তিনি বেঁচে থাকলে এই সম্মানের উপলব্ধিটা করতে পারতেন। অদ্ভুত জাতি, অদ্ভুত নিয়ম। আপনার মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের অনুরোধ করব, এখনো অনেকেই আছেন বেঁচে, মূল্যায়ন করতে শিখুন প্লিজ। এই স্বীকৃতি জিন্দা রুহকে দিলে ওই রুহ থেকে যে সন্তুষ্টির দোয়া আসে, ওটা কাজে দেবে।’
ফারজিন রহমান পুশন লিখেছেন, ‘অনেক দেরি করে হলেও বাংলাদেশ সরকার গুণী ব্যক্তিত্বের সম্মান দিলেন। বেঁচে থাকতে এ পুরস্কার আপন হাতে নেওয়ার মতো ভাগ্য যেন প্রতিটি মহীরুহের হয়। অনেক অনেক দোয়া এবং ভালো লাগল কিংবদন্তি সংস্কৃতি-ব্যক্তিত্ব মরহুম বশির আহমেদ স্বাধীনতা মরণোত্তর পুরস্কার পাচ্ছেন।’
১৯৩৯ সালের ১৯ নভেম্বর কলকাতার খিদিরপুরে জন্মগ্রহণ করেন বশির আহমেদ। তার বাবার নাম নাসির আহমেদ। দিল্লির এক মুসলিম পরিবারের সন্তান বশির আহমেদ কলকাতায় ওস্তাদ বেলায়েত হোসেনের কাছ থেকে সংগীত শেখার পর মুম্বাইয়ে চলে যান। সেখানে উপমহাদেশের প্রখ্যাত ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁর কাছে তালিম নেন। ১৯৬৪ সালে সপরিবারে ঢাকায় আসেন। ঢাকায় আসার আগেই উর্দু চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু করেন বশির আহমেদ। চলচ্চিত্রে ‘যব তোম একেলে হোগে হাম ইয়াদ আয়েঙ্গে’ গানটি পাকিস্তানে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তার কণ্ঠস্বর ছিল মাধুর্যে ভরা। রাগ সংগীতেও দখল ছিল তার। ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খাঁর কাছে তালিম নেন তিনি। তালাশ চলচ্চিত্রে প্রখ্যাত শিল্পী তালাত মাহমুদের সঙ্গে কাজ করেন। বাংলাদেশি এই সংগীতশিল্পী পাকিস্তান আমলে আহমেদ রুশদি বলে পরিচিত ছিলেন। তিনি শিল্পী নূর জাহানের সঙ্গে অনেক উর্দু গান গেয়েছেন।
‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’ ছবিতে গানের জন্য ২০০৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ গায়ক) পান। ২০০৫ সালে পান একুশে পদক। কুচ আপনি কাহিয়ে কুচ মেরি সুনিয়ে, ইয়ে শাম ইয়ে তানহায়ে ইউ চুপ তো মাত রাহিয়ে, আমি রিকশাওয়ালা মাতওয়ালা, আমাকে পোড়াতে যদি এত লাগে ভালো, আমার খাতার প্রতি পাতায়, যা রে যাবি যদি যা, অনেক সাধের ময়না আমার, বন্ধু সেই দেখা কেন শেষ দেখা হলোসহ অসংখ্য কালজয়ী গান গেয়েছেন। ২০১৪ সালের ১৯ এপ্রিল মোহাম্মদপুরে নিজের বাসায় তিনি ইন্তেকাল করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

