আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

এবার নির্বাচনি গান তৈরির হিড়িক জমজমাট ভোটের মাঠ

মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

এবার নির্বাচনি গান তৈরির হিড়িক জমজমাট ভোটের মাঠ

সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অনলাইনে প্রচার জমে উঠেছে। বড় দলগুলোর পাশাপাশি প্রার্থীরাও ব্যক্তিগত উদ্যোগে গান বানাচ্ছেন। সেসব গানে উঠে আসছে গণভোট কিংবা নিজ নিজ দলের প্রতীকের কথা, উঠে আসছে নানা সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতি। সংগীতবোদ্ধারা বলছেন, নির্বাচনে গানের ব্যবহার দলগুলোর খুবই বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত। এবারের কিছু গান ভোটারদের মনোজগতে প্রভাব ফেলেছে।

বিজ্ঞাপন

গত বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আইডি এবং বিএনপির ইউটিউব চ্যানেল থেকে একটি গান পোস্ট করা হয়। ‘ভোট দিব কিসে, ধানের শীষে’ শীর্ষক গানটি লেখার পাশাপাশি সুর করেছেন মো. তানভীর চৌধুরী। গানটি গেয়েছেন, আতিয়া আনিশা ও নিলয়। ‘১৭ বছর পরে ভোট আইল দেশ জুড়ে/ থাকব নাকো ঘরে বসে কেন্দ্রে যাব মিলেমিশে/ ভোট দিব কিসে ধানের শীষে, ভরসা আছে কিসে ধানের শীষে/ জোর জুলুমের দিন শেষ, সবার আগে বাংলাদেশ, সবাই মিলে গরব দেশ’— এমন কথায় জমজমাট সুরে গানের ভিডিওতে উঠে আসে গ্রামবাংলার প্রাণ-প্রকৃতি, কৃষকের ফসল ফলানো, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ও জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার দেশ গড়ার নানা পদক্ষেপ। উঠে এসেছে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ। মুক্তির কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গানটি দশ লাখের বেশি দর্শক দেখেছেন।

এছাড়া দলটির বিভিন্ন স্তরের কর্মী-সমর্থকরাও তাদের প্রোফাইলে গানটি আপলোড করেন। নির্বাচনি প্রচারের ভিডিওতে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে। বিএনপি থেকে মনোনীত বিভিন্ন প্রার্থীও নিজ উদ্যোগে নির্বাচনি গান বানাচ্ছেন। এআই দিয়ে বানানো মির্জা ফখরুল ইসলাম আলগমীর ও মির্জা আব্বাসের নির্বাচনি গান পাওয়া যায় ইউটিউবে।

জামায়াতের নির্বাচনি গান

মাসখানেক আগে নির্বাচনি গান প্রকাশ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গানটি সামাজিক মাধ্যমে এত বেশি ছড়িয়ে পড়েছে যে কে প্রথম পোস্ট করেছিল সেটাই খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ইউটিউবে ইয়াসির আরাফাত শাফী নামের একটি চ্যানেলে মুক্তি দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায় মাস খানেক আগে। মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে গানটি ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুক ইউটিউবসহ সব সামাজিক মাধ্যমে। লাখের উপরে রিলস বানানো হয় গানটি নিয়ে। শুধু ইয়াসিন আরাফাতের ইউটিউব চ্যানেলের গানটি দেখা হয়েছে ২১ লাখের বেশি বার।

গানের ডিস্ক্রিপশনে লেখা হয়েছে, দাঁড়িপাল্লা— ইসলামি চেতনা, ন্যায় ও সত্যের প্রতীক। এ গজলটিতে তুলে ধরা হয়েছে আদর্শ, ন্যায়বিচার এবং পরিবর্তনের কথা। নির্বাচনি আবহে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও আশা ফুটে উঠেছে এই নাশিদে।

গানের কথা লিখেছেন—হাসান আল বান্নাহ, সুর করতে সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে আরটিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের। মিউজিক করেছেন মশিউর রহমান শাকের। ‘দেখে দেখে কেটে গেল বেলা/ বদলে যাচ্ছে দ্যাখো খেলা/ ঘুরে যায় রাজনীতির দান/ জনগণ জানে সমাধান/ ভালো লোকের হোক এবার পাল্লা/ মানুষের মুখে দাঁড়িপাল্লা/ খুলে দাও হৃদয়ের জাল্লা/জিতবে এবার দাঁড়িপাল্লা। সাধারণ মানুষের কাছে যাও/ একটুও কি তুমি টের পাও? কার পাশা গেছে কার টেবিলে/ খেলা যে চলছে কোন লেভেলে?’ এমন কথায় গানটিতে নির্বাচনের আবহ ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো সুর করা হয়েছে।

এছাড়াও বিভিন্ন আসনে আলোচিত জামায়াত নেতাদের নিজস্ব গান ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। এই তালিকায় আছেন আব্দুল্লাহ মো. তাহের, রেজাউল করিম, মওলানা রফিকুল ইসলাম খানসহ বেশিরভাগ কেন্দ্রীয় নেতাদের গান স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে গেছে।

এনসিপির প্রযুক্তিনির্ভর গানে চমক

জুলাই অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচনি গান শুরু করে সবার আগে। গত বছরের নভেম্বর মাসে দলটি নির্বাচনি প্রতীক পাওয়ার পর ‘শাপলা কলি’ শিরোনামে একটা গান প্রকাশ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সহায়তায় দলটির ছাত্র সংগঠন ছাত্রশক্তির নেতা জোবায়ের হোসেন গানটি তৈরি করেন। এ আই দিয়ে বানানো গানটি মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ‘জুলাইয়ের চেতনায় জ্বলে আলো/জনতার ডাকে সামনে চলো/ ভাঙল শৃঙ্খল কাঁপল দেশ/শাপলা কলি জাগালো নতুন রেশ/ শাপলা কলি শাপলা কলি/ জাগো জনতা ওঠাও বুলি/ এনসিপি জনে জনে শক্তি/ ফিরিয়ে আনবে রাষ্ট্রের মুক্তি।’

কথা ও সুরের কারণে গানটি জুলাইপ্রেমীদের মাঝে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

গণভোটের প্রচারে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে আরেকটি গান বানান ছাত্রশক্তির নেতা জোবায়ের হোসেন। সে গানটিও খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। এখন পর্যন্ত হ্যাঁ ভোটের পক্ষে এটাই সবচেয়ে আলোচিত ও জনপ্রিয় গান। গত শনিবার আনুষ্ঠানিক এনসিপির নির্বাচনি থিম সং মুক্তি দেওয়া হয়। ‘এনসিপিরে বরণ করো শাপলা কলির মালায়’ শিরোনামের গানটিও মুক্তির পর তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। দলটির শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলাম, নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী, হাসনাত আব্দুল্লাহসহ প্রায় সব এমপি প্রার্থীর নামে আলাদা আলাদা গান বানানো হয়েছে।

পিছিয়ে নেই অন্যান্য দল ও সরকার

ভোট কিংবা গণভোটের প্রচারে গানের আশ্রয় নিতে দেখা গেছে বর্তমান আন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেও। গণভোট নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে সরকারের পক্ষ থেকে আট বিভাগের জন্য বানানো হয়েছে আটটি ভিন্ন গান। আঞ্চলিকতাকে প্রাধান্য দিয়ে বানানো হয়েছে গানগুলো। জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবরও নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে গান গেয়েছেন। ‘ভয় নাই আর ভয় নাই, চলো সবাই কেন্দ্রে যাই/ আনন্দ আর উৎসবে এবার সবাই ভোট দেবে।’ এমন কথায় ভোটারদের ১৭ বছর পর আয়োজিত এই নির্বাচনে নির্ভয়ে ভোটে অংশ নেওয়ার উৎসাহ দিতে দেখা যায়।

বাংলাদেশ খেলাফত মসলিসের প্রতীক রিকশা নিয়ে গান মুক্তি দেওয়া হয় দলটির ফেসবুক পেজ থেকে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতীক হাতপাখা নিয়েও বেশ কয়েকটি গান আলোচনায় আছে। এছাড়াও বিভিন্ন প্রার্থী এককভাবে গান বানিয়েছেন।

সংগীতজ্ঞদের মত

জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী মনির খান বিষয়টিকে দেখছেন খুবই ইতিবাচক হিসেবে। আমার দেশকে মনির খান বলেন, ’১৭ বছর পর আমরা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। বাঙালির উৎসবের সঙ্গে গানের সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের। যার প্রকাশ দেখা যাচ্ছে ভোটের মাঠে। সংগীতপ্রিয় মানুষ ভোটের মতো এত বড় উৎসব গান ছাড়া পার করে দিতে পারে না। ভোট ও গানের এই জোয়ার একটা কথাই প্রমাণ করে আমরা যেমন গণতন্ত্রমুখী তেমনি সংগীতমুখী।’

গানে এআইয়ের ব্যবহারকেও ইতিবাচকভাবেই দেখছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এই শিল্পী। তিনি বলেন, ‘পৃথিবী যত এগিয়ে যাবে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবে সংগীতও। গানে এআইয়ের ব্যবহার তারই উদাহরণ। আমি বিষয়টাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছি। যতদিন এআই মানুষের জন্য ক্ষতিকর না হয়ে উঠে ততদিন ঠিক আছে।’ গান ভোটারদের টানতে না পারলেও ভোটের উৎসব জমিয়ে তোলায় ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন মনির খান।

চলচ্চিত্র পরিচালক ও বর্তমানে রাজনীতি বিশ্লেষক মালেক আফসারি মনে করেন গান শুনেও অনেকে মত বদলাবে। যে দল ভালো গান করবে তাদের ভোট বাড়বে। তিনি বলেন, ‘একটা ভালো গানে উঠে আসে দেশের পরিস্থিতি, দলের চিন্তাভাবনা ও প্রতিশ্রুতির কথা। ভালোভাবে গান করতে পারলে তা ভোটারদের অবশ্যই প্রভাবিত করতে পারে।’

মালেক আফসারি জানান, তিনি প্রায় সব গানই শুনেছেন। তার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে দাঁড়িপাল্লার গানটা। এখানে একটা লাইন আছে, ‘কার পাশা যাচ্ছে কার টেবিলে, খেলা যে চলছে কোন লেভেলে’। তিনি মনে করেন, এই লাইন দিয়ে ভোটারদের মনোজগতে প্রভাব ফেলবে। ভোটাররা ভাববেন, সত্যিই বুঝি এবার পুরোনো খেলা বদলে যাচ্ছে। ফলে গানের কারণেও দলটি বেশ কিছু ভোট টানবে।

বিজ্ঞাপন জগতের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর, জিঙ্গেল নির্মাতা রাসেল আহমেদ মনে করেন, ভোটের গানের মেয়াদ কম। ভোট চলে গেলে গানের আবেদন খুব একটা থাকে না। সেই অর্থে অল্প খরচে ও কম সময়ে এআই ব্যবহার করে গান করাটা খুবই যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত। রাসেল আহমেদ বলেন, ‘গানে গানে কথা বললে সেটা মানুষের সহজে মনে থাকে। যে কারণে আমরা বিজ্ঞাপনে পণ্যের প্রচারে গান ব্যবহার করি। গান অনেকটা স্লোগানের মতো। ফলে এবার নির্বাচনে গানের ব্যবহারটা দলগুলোর খুবই বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত।’

নির্বাচনে গানের ব্যবহারকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন বেবি নাজনীন, ন্যান্সি, পড়শী, ইমরানসহ এই প্রজন্মের শিল্পীরাও।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন