জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উপজেলা শিক্ষা অফিসে জনবল সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। উপজেলার ২০১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১২৮টিতেই নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। এর মধ্যে ২৭টি বিদ্যালয়ে চলতি দায়িত্বে এবং ১০১টিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকের ৭৫টি পদও শূন্য রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট থাকায় বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে। প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সহকারী শিক্ষককে পাঠদানের পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজ করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষকদের ওপর বাড়ছে বাড়তি চাপ এবং শিক্ষার্থীরাও কাঙ্ক্ষিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষক ও অভিভাবকদের।
শুধু বিদ্যালয়গুলোতেই নয়, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসেও জনবল সংকট রয়েছে। অনুমোদিত ১২টি পদের মধ্যে ছয়টিই শূন্য। ফলে বিদ্যালয় পরিদর্শন, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও শিক্ষা কার্যক্রম তদারকিতে কর্মকর্তাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, মাদারগঞ্জের সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ২০১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬৪ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এসব বিদ্যালয়ের মধ্যে কোয়ালিকান্দি, ঝাড়কাটা, চরনগর, পূর্ব চরপাকেরদহ, চাঁদপুর সন্ধ্যাজান, বালিজুড়ী আরএ, চর নাংলা, পশ্চিম জটিয়ারপাড়া, চরপাড়া ইসলামিয়া ও জোড়খালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ১২৮টি বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই।
প্রধান শিক্ষক না থাকায় জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সহকারী শিক্ষকদের কাউকে চলতি দায়িত্ব এবং কাউকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে তাঁদের নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজও সামলাতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, সহকারী শিক্ষকের ৭৫টি পদ শূন্য থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতও ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষক সংকটের কারণে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে একাধিক শ্রেণির পাঠদান ও অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাতে শিক্ষকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে আরও জানা গেছে, অফিসে অনুমোদিত ১২টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ছয়জন। তাঁদের মধ্যে একজন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, তিনজন সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, একজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর এবং একজন উচ্চমান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক রয়েছেন।
অপরদিকে, তিনজন সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, একজন হিসাব সহকারী, একজন অফিস সহকারী ও একজন অফিস সহায়কের পদ শূন্য রয়েছে। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে উপজেলার বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ ও তদারকি করতে হচ্ছে শিক্ষা কর্মকর্তাদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক বলেন, প্রধান শিক্ষকের পরিবর্তে সাধারণ শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত করে বিদ্যালয় পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে সহকর্মীরা যথাযথভাবে মানতে চান না। আবার দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরাও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধায় পড়েন। দ্রুত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির মাধ্যমে এ সংকট নিরসন করা প্রয়োজন।
অভিভাবক তোফায়েল আহম্মেদ, এনামুল হক ও নাজিরুল ইসলাম বলেন, উপজেলার অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিদ্যালয়ে শৃঙ্খলাও ঠিকভাবে বজায় থাকছে না। কোনো কোনো শিক্ষক সময়মতো বিদ্যালয়ে না আসায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এ কারণে অনেক অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাচ্ছেন।
চরগুজামানিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (চলতি দায়িত্ব) মোহাম্মদ শওকত আলী বলেন, প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এর সঙ্গে সহকারী শিক্ষক সংকট থাকায় শিক্ষার্থীরাও প্রয়োজনীয় পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দ্রুত প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি এবং সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়ন করা প্রয়োজন।
মাদারগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. খলিলুর রহমান বলেন, তিনি প্রায় পাঁচ মাস আগে উপজেলায় যোগদান করেছেন। অবসর, বদলি, মৃত্যু ও মামলা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রধান শিক্ষকের পদগুলো শূন্য হয়েছে। শূন্য পদের তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষা অফিসেও সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাসহ ছয়টি পদ শূন্য রয়েছে। এতে দাপ্তরিক কাজ ও বিদ্যালয় পরিদর্শনে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। জনবল সংকটের মধ্যেও শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ চলছে। দ্রুত শিক্ষা অফিসে জনবল এবং বিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক দেওয়া হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

