বুকজ্বালা কেন বাড়ে?

বুকজ্বালা কেন বাড়ে?

মাঝেমধ্যে আমাদের প্রায় সবারই বুকজ্বালা বা হার্টবার্নের সমস্যা হতে পারে। এটি সাধারণত বুক বা পাকস্থলীতে শুরু হওয়া এক ধরনের অস্বস্তিকর জ্বালাপোড়া, যা কখনো কখনো গলা পর্যন্ত উঠে আসে। অতিরিক্ত ঝাল খাবার খাওয়া কিংবা অ্যালকোহল পান করার পর এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। মাঝেমধ্যে বুকজ্বালা হওয়া সাধারণত গুরুতর কোনো বিষয় নয়। তবে এটি যদি ঘন ঘন হতে থাকে, তাহলে তা গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (জিইআরডি) বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের লক্ষণ হতে পারে।

অ্যাসিড রিফ্লাক্সের অন্যতম প্রধান উপসর্গ হলো বুকের ভেতর জ্বালাপোড়া বা ব্যথা, যা ধীরে ধীরে গলার দিকে উঠে আসে। এছাড়া খাবার বা তরল মুখের দিকে উঠে আসার অনুভূতি, গলার পেছনে তিক্ত বা টক স্বাদ এবং ঝুঁকে বসলে বা শুয়ে পড়লে—বিশেষ করে রাতে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া বেড়ে যাওয়াও এর সাধারণ লক্ষণ। অ্যাসিড রিফ্লাক্সের পেছনে নানা ধরনের কারণ থাকতে পারে। ধূমপান এবং অতিরিক্ত পরিমাণে খাবার গ্রহণ এ সমস্যা বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতাও এর ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ অনেকের ক্ষেত্রে অ্যাসিড রিফ্লাক্সের উপসর্গকে তীব্র করে তুলতে পারে।

বিজ্ঞাপন

তবে কিছু নির্দিষ্ট খাবার ও পানীয়ও অ্যাসিড রিফ্লাক্স এবং বুকজ্বালা সৃষ্টি বা বাড়িয়ে দিতে পারে। যাদের নিয়মিত এ ধরনের সমস্যা হয়, তাদের জন্য তাই কোন খাবারগুলো উপসর্গ বাড়ায় তা জানা এবং সম্ভব হলে সেগুলো এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা বুকজ্বালার প্রবণতা থাকলে খাদ্যাভ্যাসের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন খাবার উপসর্গের কারণ হতে পারে। নিজের ক্ষেত্রে কোন খাবার বা পানীয় বুকজ্বালা বাড়ায়, তা লক্ষ করে সেগুলো সীমিত করা উপকারী। অ্যাসিড রিফ্লাক্স ও বুকজ্বালা নিয়ন্ত্রণে রাখতে খাদ্যাভ্যাসে সচেতন হওয়া সবচেয়ে কার্যকর উপায়। যেসব খাবার ও পানীয় পাকস্থলীর অ্যাসিডের মাত্রা বাড়ায় বা খাদ্যনালির ভালভ (এলইএস) শিথিল করে দেয়, সেগুলোর একটি বিস্তারিত তালিকা নিচে দেওয়া হলো—

সমস্যা সৃষ্টিকারী খাবার

১. চর্বিযুক্ত ও ভাজাপোড়া খাবার। খাসি বা গরুর মাংস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, পরোটা, শিঙাড়া, সমুচা এবং অতিরিক্ত তেল-ঘিয়ে রান্না করা খাবার পাকস্থলীতে দীর্ঘক্ষণ থাকে। এগুলো হজম হতে বেশি সময় নেয় এবং পাকস্থলীর ওপর চাপ সৃষ্টি করে অ্যাসিড ওপরে তুলে আনে।

২. ⁠ঝাল ও মসলাদার খাবার। অতিরিক্ত মরিচ, গরম মসলা, কাঁচা পেঁয়াজ ও রসুন পাকস্থলীর ভেতরের আবরণকে (Lining) উত্তেজিত করে এবং বুকজ্বালা তীব্র করে তোলে।

৩. ⁠টকজাতীয় ফল ও টমেটো। লেবু, কমলা, মাল্টা, জাম্বুরা, তেঁতুল এবং টমেটোতে (বা টমেটো সস/কেচাপ) প্রচুর পরিমাণে সাইট্রিক ও ম্যালিক অ্যাসিড থাকে, যা সরাসরি বুকজ্বালা বাড়ায়।

৪. ⁠চকোলেট খেলেও সমস্যা হয়। চকোলেটে থাকা ক্যাফেইন, থিওব্রোমিন এবং উচ্চমাত্রার চর্বি লোয়ার ইসোফেজিয়াল স্পিংক্টারকে (এলইএস) শিথিল করে দেয়, ফলে অ্যাসিড সহজেই গলায় উঠে আসে।

৫. ⁠ক্যাফেইন ও চা-কফি। গাঢ় চা, কফি এবং এনার্জি ড্রিংকসে থাকা ক্যাফেইন পাকস্থলীতে অ্যাসিডের নিঃসরণ অনেক বাড়িয়ে দেয়।

৬. ⁠কার্বোনেটেড বা কোমলপানীয়। সোডা, সফট ড্রিংকস বা গুরুপাক পানীয়র গ্যাস পাকস্থলীতে চাপ সৃষ্টি করে প্রসারিত করে, যা অ্যাসিডকে ওপরের দিকে ঠেলে দেয়।

৭. সাধারণ ধারণার বিপরীতে, পুদিনা পাতা পাকস্থলী ঠান্ডা করলেও এটি খাদ্যনালির নিচের পেশি শিথিল করে ফেলে, যা রিফ্লাক্সের রোগীদের জন্য ক্ষতিকর।

৮. ⁠প্রসেসড ও ফাস্টফুড। প্রসেসড মিট, পিৎজা, বার্গার ও প্যাকেটজাত স্ন্যাকসে প্রচুর সোডিয়াম ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, যা হজমে ব্যাঘাত ঘটায়।

অ্যাসিড রিফ্লাক্স এড়াতে করণীয়

১. একসঙ্গে পেট ভরে না খেয়ে অল্প অল্প করে দিনে ৫-৬ বার আহার করুন।

২. রাতে খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়া থেকে বিরত থাকুন। অন্তত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা পর ঘুমাতে যান।

৩. খাবার গ্রহণের মধ্যে অতিরিক্ত পানি না খেয়ে খাবারের আধা ঘণ্টা আগে বা পরে পানি পানের অভ্যাস করুন।

৪. কোন নির্দিষ্ট খাবারটি খেলে আপনার নিজস্ব বুকজ্বালা বাড়ছে, তা নোট করে রাখুন এবং খাদ্যতালিকা থেকে সেটি বাদ দিন।

উপসর্গ যদি নিয়মিত হয় এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পরও না কমে, তবে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি

সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ, ঢাকা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন