হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় প্রায় ১১ বছর ধরে পড়ে আছে চারটি বেসরকারি এয়ারলাইন্স কোম্পানির ১২টি পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ। দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকায় এগুলো এখন কার্যত স্ক্র্যাপে পরিণত হয়েছে। নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েও মিলছে না দেশি-বিদেশি ক্রেতা। এ কারণে বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল অ্যাপ্রোন এলাকা দখল করে থাকা উড়োজাহাজগুলো সরানো যাচ্ছে না। এতে করে ব্যাহত হচ্ছে কার্গো কার্যক্রমসহ রপ্তানি পণ্য ওঠানামা ও উড়োজাহাজ পার্কিং। একই সঙ্গে কার্গো ভিলেজের সম্প্রসারণেও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা।
সূত্র জানায়, সবচেয়ে বড় বিষয়, বন্ধ হয়ে যাওয়া চার এয়ারলাইন্সের কাছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু জিএমজি এয়ারলাইন্সের কাছেই পাওনা তিন হাজার কোটি টাকার বেশি। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের কাছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। বাকি টাকা রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও অ্যাভিয়েন চ্যার্টারের কাছে পাওনা।
এই পরিস্থিতিতে অনেকটা হতাশ হয়ে গত ১৬ জুলাই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে বেবিচক। চিঠিতে উড়োজাহাজগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। ক্রেতা না পাওয়া গেলে এগুলো ভাঙাড়ি হিসেবে কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকবে না বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সন্ধানও চলছে।
এ বিষয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক আমার দেশকে বলেন, উড়োজাহাজগুলো বিক্রির জন্য দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করা হচ্ছে। এ বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। এয়ারলাইন্সগুলোর কোম্পানির কাছে বেবিচকের বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওনা রয়েছে। অন্যদিকে, এসব উড়োজাহাজ বিমানবন্দরের কার্যক্রমেও ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।
চিঠি দিয়েও মিলছে না সমাধান
বেবিচক সূত্র জানায়, ১২ উড়োজাহাজের উড্ডয়নযোগ্যতার সনদের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। পরে প্রচলিত আইন অনুযায়ী উড়োজাহাজগুলোর নিবন্ধন বাতিল করা হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু তারা কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৩০ দিনের চূড়ান্ত নোটিস দেওয়া হয়।
ওই নোটিসে বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উড়োজাহাজ অপসারণ না করলে সেগুলো বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রি করা হবে। পরে এ বিষয়ে কোনো আপত্তি গ্রহণ করা হবে না। এরপর বিষয়টি সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানো হয়। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত নেওয়া হয়। পরে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স, বন্ধক গ্রহণকারী ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়।
সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে ২০২৪ সালের ২৬ মে উড়োজাহাজগুলো বাজেয়াপ্ত করে বেবিচক। পরে জাতীয় দৈনিকে এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়। তবে বাজেয়াপ্ত করার পরও বিক্রির পথ সহজ হয়নি। সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ।
১১ বছর ধরে অ্যাপ্রোনে
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শাহজালাল বিমানবন্দরের উত্তর পাশে মূল্যবান অ্যাপ্রোন এলাকায় ১১ বছর ধরে চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে গলার কাঁটা হয়ে আছে ১২টি উড়োজাহাজ। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে এগুলো বাজেয়াপ্ত করেছে বেবিচক।
বেবিচক সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডোর আবু সাঈদ মেহবুব খান আমার দেশকে বলেন, দীর্ঘদিন পড়ে থাকা উড়োজাহাজগুলো বিমানবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। এগুলো ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নিলামে তোলার অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, উড়োজাহাজগুলোর মূল্য নির্ধারণে যে ব্যয় হবে, বিক্রি করে সেই অর্থ আদায় করা যাবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। বাস্তবে এগুলো এখন স্ক্র্যাপে পরিণত হয়েছে।
বেবিচক সূত্র বলছে, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করতেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হতে পারে। উড়োজাহাজ বিক্রি করে সেই ব্যয় ওঠার সম্ভাবনাও কম। তারপরও কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা চলছে।
মিলছে না ক্রেতা
বকেয়া আদায়ের লক্ষ্যে পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো বাজেয়াপ্ত ও নিলামে বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু করে বেবিচক। ২০২১ সালের শেষ দিকে এবং ২০২২ সালজুড়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় দরপত্র আহ্বান করা হয়। একাধিকবার নিলামের চেষ্টা হলেও উপযুক্ত কোনো ক্রেতা পাওয়া যায়নি।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ দেখছেন। প্রথমত, উড়োজাহাজগুলো ১০ থেকে ১১ বছর ধরে খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে পড়ে আছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় ইঞ্জিন, এভিয়নিক্স সিস্টেম, ককপিটের যন্ত্রপাতি ও ল্যান্ডিং গিয়ার নষ্ট এবং মরিচায় অকেজো হয়ে গেছে। এগুলোকে আবার উড্ডয়নের উপযোগী করতে যে অর্থ ব্যয় হবে, তা কোনোভাবেই অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়।
দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ উড়োজাহাজই পুরোনো মডেলের। এর মধ্যে রয়েছে ড্যাশ-৮, এমডি-৮৩ ও বোয়িং ৭৩৭-৩০০। বিশ্বজুড়ে এসব মডেলের ব্যবহার এখন সীমিত। ফলে উড়োজাহাজের সচল যন্ত্রাংশ খুলে অন্য বিমানে ব্যবহার কিংবা যন্ত্রাংশ হিসেবে বিক্রি করার বাজারও প্রায় নেই।
তৃতীয়ত, মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাংকঋণ ও অন্যান্য পাওনাদারের মামলা রয়েছে। ফলে আইনি জটিলতায় পড়ার আশঙ্কায় সম্ভাব্য ক্রেতারাও উড়োজাহাজগুলো কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
যে চার কোম্পানির এয়ারক্রাফট
বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের উত্তর পাশে বিশাল এলাকাজুড়ে পড়ে আছে বন্ধ হয়ে যাওয়া চারটি বেসরকারি এয়ারলাইন্সের ১২টি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের আটটি, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের দুটি, জিএমজি এয়ারলাইন্স এবং অ্যাভিয়েন চ্যার্টারের একটি করে উড়োজাহাজ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলোর মালিকরা প্রভাব খাটিয়ে অ্যাপ্রোন এলাকার মূল্যবান জায়গা দখল করে উড়োজাহাজগুলো রেখে গেছেন।
বেবিচকের পাওনা ৪ হাজার কোটি টাকা
বছরের পর বছর উড়োজাহাজগুলো পার্ক করে রাখায় বেবিচকের নিয়ম অনুযায়ী পার্কিং ফি এবং এর ওপর সারচার্জ যুক্ত হয়েছে। বেবিচকের হিসাব শাখা সূত্রে জানা যায়, বকেয়া ও চক্রবৃদ্ধি হারের সারচার্জ মিলিয়ে চার কোম্পানির কাছে সংস্থাটির মোট পাওনা প্রায় চার হাজার কোটি টাকা।
এর মধ্যে জিএমজি এয়ারলাইন্সের কাছেই পাওনা তিন হাজার কোটি টাকার বেশি। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের কাছে বকেয়া প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। অবশিষ্ট অর্থ রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও অ্যাভিয়েন চ্যার্টারের কাছে পাওনা।
এক লাখ ৯২ হাজার বর্গফুট দখল
এদিকে নিলামে উড়োজাহাজগুলো বিক্রি করতে না পারায় বেবিচকের উদ্বেগ আরো বেড়েছে। বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পর কার্গো হ্যান্ডলিং ও অন্যান্য লজিস্টিক সুবিধা সম্প্রসারণের জন্য জায়গাটি দ্রুত খালি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। ১২টি উড়োজাহাজ এক লাখ ৯২ হাজার ১০০ বর্গফুট এলাকা দখল করে রেখেছে। এটি বিমানবন্দরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল এলাকা। এখান থেকেই কার্গো কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এ কারণে ব্যাহত হচ্ছে রপ্তানি পণ্য ওঠানামা। চাপ বাড়ছে কার্গো পরিচালনার ওপর। ফলে বিমানবন্দরের সক্ষমতাও পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এগুলো অপসারণ করা না গেলে ভবিষ্যতে রপ্তানি কার্যক্রম বাড়লে সংকট আরো তীব্র হতে পারে।
মন্ত্রণালয়ে বিশেষ চিঠি
চলতি বছর ১৬ জুলাই বেবিচক চেয়ারম্যান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠান। এতে উড়োজাহাজগুলো সরানো ও বিক্রির বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চাওয়া হয়। এই কাজে বিমান বাহিনী ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সহযোগিতাও চেয়েছে বেবিচক।
তবে দেশে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী উড়োজাহাজ মূল্যায়নে সক্ষম কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান নেই। বিদেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে মূল্যায়নের বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু এতে যে ব্যয় হবে, তা সম্ভাব্য বিক্রয় মূল্যের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বেবিচক।
এ অবস্থায় ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি। বেবিচকের ধারণা, আন্তর্জাতিক দরপত্র হলে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতামূলকভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। এতে বাজারভিত্তিক মূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারের জন্য সর্বোচ্চ দর নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
এক সময় ছিল দাপট
বর্তমানে যে চারটি এয়ারলাইন্স কোম্পানির উড়োজাহাজ শাহজালালে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে একসময় সেগুলোর দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে দাপট ছিল। আর্থিক লোকসান, অব্যবস্থাপনা ও ঋণে জর্জরিত হয়ে ধীরে ধীরে তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
এর মধ্যে জিএমজি এয়ারলাইন্স ২০১২ সালে ফ্লাইট অপারেশন স্থগিত করে। ২০১৬ সালে বন্ধ হয়ে যায় ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ। আর কোভিড মহামারির শুরুতে ২০২০ সালের মার্চে বন্ধ হয়ে পড়ে রিজেন্ট এয়ারওয়েজ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কোম্পানিগুলোর মালিকরা বেবিচকের পাওনা ও ব্যাংকঋণ পরিশোধ করেননি। দফায় দফায় চিঠি দিয়েও তাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন




