বর্ষাকাল প্রকৃতির জন্য যেমন স্বস্তির, তেমনি স্বাস্থ্যের জন্য নানা ধরনের ঝুঁকিও নিয়ে আসে। বিশেষ করে নারীরা এ সময়ে সর্দি-কাশি, ভাইরাস জ্বর, ত্বকের সংক্রমণ, প্রস্রাবের সংক্রমণ, ছত্রাকজনিত রোগ, ডেঙ্গু, মশাবাহিত রোগ এবং পুষ্টিজনিত সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হতে পারে। তাই বর্ষাকালে নারীদের প্রয়োজন বাড়তি সচেতনতা ও স্বাস্থ্যচর্চা।
সকাল : দিনের শুরু হোক স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে
ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই এক থেকে দুই গ্লাস বিশুদ্ধ পানি পান করা উচিত। এটি শরীরের বিষাক্ত পদার্থ বের করতে সাহায্য করে এবং হজমশক্তি উন্নত করে।
সকালের নাশতায় পুষ্টিকর খাবার, যেমন ডিম, দুধ, শাকসবজি, ফলমূল ও পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার রাখা জরুরি। বর্ষাকালে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল, যেমন আমলকী, পেয়ারা, মাল্টা ও লেবু উপকারী। বাড়ির আঙিনা, ছাদ বা বারান্দায় জমে থাকা পানি পরিষ্কার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, কারণ এসব স্থানে মশার বংশবিস্তার ঘটে।
কর্মস্থল বা বাইরে যাওয়ার সময়
বৃষ্টি হলে ভেজা কাপড়ে দীর্ঘ সময় থাকা উচিত নয়। ভেজা পোশাক দ্রুত পরিবর্তন করতে হবে। সম্ভব হলে অতিরিক্ত কাপড়, ওড়না বা স্কার্ফ সঙ্গে রাখা ভালো। পা দীর্ঘ সময় ভেজা থাকলে ছত্রাক সংক্রমণ, চুলকানি ও দুর্গন্ধ হতে পারে। তাই বাইরে থেকে ফিরে পা সাবান দিয়ে ধুয়ে শুকনো রাখতে হবে।
বাইরের খোলা খাবার, কাটা ফল, অপরিষ্কার শরবত বা দূষিত পানি এড়িয়ে চলা জরুরি। কারণ বর্ষাকালে খাদ্যবাহিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়।
দুপুর : খাদ্য ও বিশ্রামে সচেতনতা
দুপুরের খাবারে ভাত, মাছ, ডাল, শাকসবজি ও সালাদের সমন্বয় থাকা উচিত। অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চললে হজমজনিত সমস্যা কম হয়। খাবারের আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখতে হবে। এটি ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কর্মব্যস্ততার মাঝেও কিছু সময় বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত মানসিক চাপ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
বিকাল : শরীরচর্চা ও মানসিক সুস্থতা
অনেকে বর্ষাকালে ঘরে বেশি সময় কাটান, ফলে শারীরিক কার্যক্রম কমে যায়। প্রতিদিন অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটা, হালকা ব্যায়াম বা যোগব্যায়াম শরীরকে সক্রিয় রাখে। ঘরের ভেতরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ছত্রাক ও জীবাণুর বৃদ্ধি বেশি হয়, যা শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। মানসিক সুস্থতার জন্য পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বই পড়া, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির বা সৃজনশীল কাজে অংশগ্রহণ উপকারী।
সন্ধ্যা : পরিচ্ছন্নতার বিশেষ যত্ন
বাইরে থেকে ফিরে হাত, মুখ ও পা ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে। প্রয়োজন হলে গোসল করা উত্তম।
বর্ষাকালে নারীদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের ত্বক ও পায়ের বিশেষ যত্ন প্রয়োজন। সামান্য ক্ষত বা সংক্রমণও অবহেলা করা যাবে না।
রাত : সুস্থ ঘুম ও রোগ প্রতিরোধ
রাতের খাবার হালকা ও সহজপাচ্য হওয়া উচিত। অতিরিক্ত মসলাযুক্ত বা ভাজাপোড়া খাবার পরিহার করা ভালো। ঘুমানোর আগে মশারি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে এটি অত্যন্ত কার্যকর। প্রতিদিন অন্তত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।
বর্ষাকালে নারীদের সাধারণ স্বাস্থ্যঝুঁকি
ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই)
কম পানি পান, দীর্ঘ সময় ভেজা কাপড় পরা এবং অপর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতার কারণে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি।
ছত্রাকজনিত সংক্রমণ
শরীরের ভাঁজযুক্ত স্থান, পায়ের আঙুলের ফাঁক ও গোপনাঙ্গে ছত্রাক সংক্রমণ হতে পারে। শরীর শুকনো রাখলে ও পরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করলে ঝুঁকি কমে।
ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ
জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা বা দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
ত্বকের সমস্যা
অ্যালার্জি, ঘামাচি, চুলকানি ও বিভিন্ন ত্বকসংক্রান্ত সংক্রমণ বর্ষায় বেশি দেখা যায়। পরিচ্ছন্নতা ও সঠিক পোশাক নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ। ত্বকের কোনো সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে ওষুধ সেবন না করাই উত্তম।
পরিশেষে বলা যায়, বর্ষাকালে নারীর সুস্থতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস, বিশুদ্ধ পানি পান, মশা নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং মানসিক প্রশান্তি। দিনের প্রতিটি সময় সচেতনভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে বর্ষার সাধারণ রোগব্যাধি থেকে অনেকাংশে সুরক্ষিত থাকা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

