একটি সাধারণ বিকালের ঘোরাঘুরি কখনো মানুষের জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। তরুণ উদ্ভাবক রেজওয়ান রশীদের জীবনেও এমনই এক মুহূর্ত এসেছিল। ঢাকার গুলশান এলাকায় একদিন ঘুরতে গিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো কাছ থেকে একটি গো-কার্ট দেখতে পান। ছোট আকারের চার চাকার এই যান তার মনে গভীর কৌতূহল সৃষ্টি করে। কীভাবে এটি তৈরি করা হয়, কীভাবে চলে, এর প্রযুক্তিগত কাঠামো কেমন—এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে তার মনে। সেই কৌতূহলই পরবর্তী সময়ে তাকে নিয়ে যায় এক নতুন উদ্ভাবনের দিকে।
মোটরসাইকেলের প্রতি রেজওয়ানের আগ্রহ ছিল। নিজের দুটি মোটরসাইকেলও রয়েছে। তবে ছিল না চার চাকার কোনো যান। ছোটবেলা থেকেই যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসতেন তিনি। তাই নিজের হাতে একটি চার চাকার যান তৈরির স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। গো-কার্ট দেখার অভিজ্ঞতার পর সেই স্বপ্ন আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নিজেই একটি গো-কার্ট তৈরি করবেন।
প্রথম দিকে এটি ছিল শুধুই শখের একটি প্রকল্প। কোনো বাণিজ্যিক পরিকল্পনা বা বড় লক্ষ্য তখন তার সামনে ছিল না। ইন্টারনেট ঘেঁটে তথ্য সংগ্রহ, বিভিন্ন ভিডিও দেখা, নকশা তৈরি এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার মাধ্যমে তিনি কাজ শুরু করেন। সীমিত যন্ত্রপাতি এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি থেমে থাকেননি। ধাপে ধাপে নিজের মেধা, শ্রম ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তিনি তৈরি করেন একটি গো-কার্ট।
গো-কার্টটি তৈরি হওয়ার পর সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই অবাক হন। বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করেন। কেউ জানতে চান নির্মাণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে, কেউ আবার আগ্রহ প্রকাশ করেন এমন একটি গো-কার্ট সংগ্রহ করার বিষয়ে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রেজওয়ানের কাজ দেশজুড়ে পরিচিতি লাভ করে।
তার এই সাফল্য শুধু সাধারণ মানুষের প্রশংসাই অর্জন করেনি, রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছে। উদ্ভাবনী এই কাজের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পান। সেখানে তার উদ্যোগের প্রশংসা করা হয় এবং ভবিষ্যতে আরো বড় পরিসরে কাজ করার জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়। এমন স্বীকৃতি তরুণ উদ্ভাবকের আত্মবিশ্বাস আরো দৃঢ় করে।
বর্তমানে রেজওয়ানের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। তার তৈরি গো-কার্টের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্ডারও আসতে শুরু করেছে। এসব অর্ডার বাস্তবায়নের জন্য তিনি নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। তবে ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে তিনি নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষ করে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পর্যাপ্ত জায়গাসম্পন্ন একটি ওয়ার্কশপ ও লোকবলের অভাব তার কাজের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে রেজওয়ান রশীদ বলেন, ‘গো-কার্ট প্রকল্পটিকে আরো আকর্ষণীয় ও আন্তর্জাতিক মানের করে তোলার সুযোগ রয়েছে। আমি এমন একটি ধারণা নিয়ে কাজ করতে চাই, যেখানে ঢাকার নির্দিষ্ট এলাকায় বিদেশি পর্যটকরা ছোট আকারের গো-কার্ট চালানোর অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন। এসব গো-কার্টের ওপর গাড়ির মতো শেল বা বডি বসানো থাকবে, যা দেখতে হবে ছোট আকারের বাস্তব গাড়ির মতো। এতে এটি শুধু একটি যানবাহন নয়, একটি পর্যটন ও বিনোদন অভিজ্ঞতায় পরিণত হবে।’
রেজওয়ানের বিশ্বাস, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলাদেশে তৈরি গো-কার্ট আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা সম্ভব। তিনি মনে করেন, দেশে মোটরস্পোর্টস এবং ক্ষুদ্র যানবাহন শিল্পের একটি সম্ভাবনাময় বাজার রয়েছে। সঠিক বিনিয়োগ ও সহায়তা পেলে দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগ একসময় বৈশ্বিক বাজারেও প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


তবু জুলাই দেব না ভুলিতে